loading...

বিলুপ্তির পথে হালুয়াঘাটের তাঁত শিল্প

0

ওমর ফারুক সুমন, হালুয়াঘাটঃ

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার মনিকুড়া, জয়রামকুড়া গ্রাম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প গ্রাম নামেই একসময় পরিচিত ছিল। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠানে কারিগররা নিপুন হাতে বুনতেন গারো আদিবাসী ও সকল ধর্মের লোকদের জন্যে গামছা, শাড়ি, কম্বল, চাদর সহ নানা ধরনের রুচিশীল পোশাক।

খট খট শব্দে মুখরিত থাকত হালুয়াঘাটের মনিকুড়া ও জয়রামকুড়ার তাঁতপল্লি। দিন-রাত নানা বৈচিত্রের পোষাক তৈরী করে ব্যস্ত সময় পার করতেন তাঁতি পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু পুঁজির অভাবে চাহিদা মতো পোশাক তৈরী করতে না পারায় অনেক কারিগর আজ পথে বসেছে।

যার কারনে সেই ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে এসে দাড়িয়েছে। গতকাল শনিবার উক্ত তাঁতপল্লি থেকে ঘোরে এসে জানা যায় এসব তথ্য।

সরজমিনে তঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন পুঁজির অভাবে তাঁতিরা আগের মতো এ ব্যবসায়ে আর বিনিয়োগ করতে পারছেন না। বেশির ভাগ তঁতিই পুঁজি যোগাতে মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের সুদের জালে জড়িয়ে পরেছেন।

ফলে সুদ পরিশোধ করতেই চলে যাচ্ছে তাঁতির পুঁজির বড় অংশ। এছাড়া জয়রামকুড়ার কামাল(৪৫) জানান, পুঁজির অভাবে তার তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন।

একই অবস্থা হয়েছে গাজিরভিটা, সংড়া, রান্ধনিকুড়া, গোষবেড় গ্রামের পুরনো সেই তাঁপাড়ায়। যা আজ হয়েছে বিলুপ্ত। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শুরু হয়েছিল এখানে তাঁতযন্ত্রের মাধ্যমে পোশাক তৈরীর কাজ।

এই দুই গ্রামে প্রায় ৫ হাজার পরিবারের বসবাস। অনেক পরিবারই তাঁতের তৈরি কাপড় বুননের কাজে সাথে জড়িত ছিল। তারা বলসুতা, পুরোনো সোয়েটারের উল দিয়ে কম্বল, গায়ের চাদর, গামছা, শাড়ি, মাফলারসহ আরও অনেক কিছুই তৈরী করতেন।

নানা প্রতিকুলতা সত্তেও এখানকার ২ হাজার পরিবারের মধ্যে এখন মাত্র শতাধিক মানুষ বংশানুক্রমে এখনও তাঁত শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছেন। তারা আগে শাড়ি-লুঙ্গি তৈরী করলেও বর্তমানে গারো আদিবাসীদের জন্যে ধকমান্ডা সহ নানা ধরনের পোশাক তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

এসব তাঁতির বাড়িতে ২ থেকে ৬ টি করে তাঁত এখনও আছে। এর কোনোটা রড এর চাকাওয়ালা, আবার কোনোটা একেবারেই বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরী করা। সকাল থেকেই নারী-পুরুষসহ তাঁতি পরিবারের সকলে লেগে পড়েন কম্বল, গামছা, গারোদের জন্যে শাড়ি, দকমান্ডা তৈরির কাজে।

উত্তর মনিকুড়া গ্রামের তাঁতি শাহাদত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় ২০ বৎসর যাবত তাঁতের তৈরি কাপড় বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাচ্ছেন কিন্তু কোনদিন কারও কাছ থেকে কোন সাহায্য তিনি পাননি।

সরকার যদি আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করতো তাহলে সারাবছর আমরা তাঁত এর কাজ করে একটু ভালোভাবে চলতে পারতাম পরিবারকে নিয়ে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সুতার দাম এখন অনেক বেশি তাই তাদের এখন আর ব্যাবসা আগের মত নেই।

বেশি বিক্রি হয় না। এছাড়া মেশিনে তৈরি কাপড় অনেক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে আমাদের জিনিস কেউ নিতে চাননা । তিনি আরও বলেন, আমাদের নিজের কোন পুঁজি নাই। আর্থিকভাবে আমরা এখনো স্বচ্ছল না।ঋণ নিয়ে সুতা কিনে কম্বল তৈরি করি। সরকারিভাবে কোন আর্থিক সহযোগিতা পেলে আমাদের এই শিল্পকে টিকে রাখা সম্ভব হবে।

এদিকে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত পুরনো কারিগর ফজিলা খাতুন (৪০) বলেন, তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে হলে স্বল্প সুদে তাঁতিদের ঋণ দেওয়া হলে এই পুরোনো দিনের তাঁত শিল্পকে হয়তো বাঁচানো যাবে।

তাঁত কারিগদের নিজেস্ব কোন পুঁজি না থাকায় তারা বেশি সুদে ঋণ নিয়ে তাঁতের কাপড় তৈরি করে লাভবান হতে পারছে না। তাঁত সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক আব্দুল লতিফ বলেন, পুঁজির অভাবে অনেক তাঁত কারিগররা তাদের ব্যাবসা বন্ধ করে দিয়েছে।

তার সময়ে মনিকুড়া ও জয়রামকুড়া ছাড়াও গাজিরভিটা এবং ধারায় অনেক তাঁত শিল্প ছিল যা বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়া তাঁত সমিতির সাংগঠনিক অস্বচ্ছতাও অনেকাংশে দায়ি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এবিষয়ে তাঁত এলাকার স্থানীয় চেয়ারম্যান কামরুল হাসান বলেন, আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতার জন্যে জয়রামকুড়ার তাঁত শিল্প আজ হারিয়ে যাবার উপক্রম।

বর্তমানে যদি তাঁতিদের সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা পেলে তাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং তাঁত শিল্পকে আরও উন্নত ও সমবৃদ্ধি করতে পারে।

loading...
%d bloggers like this: