হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম্য সংস্কৃতির মাছ ধরার ঐতিহ্য

0

আনোয়ার হোসেন তরফদার

আবহমান গ্রাম বাংলার জনপদে নানা ভাবে মাছ ধরার সংস্কৃতি একটি বহুল পরিচিত সংস্কৃতি। বিশেষ এক সময় প্রতিটি বাড়িতে মেহমান এলেই জাল নিয়ে পার্শ্ববর্তী পুকুরে দু-এক খেপ জাল মেরে কটা মাছ তুলে রান্না করা হতো। আবার শখ করে দল বেঁধে জলাধারে ঠেলা জাল বা মই জাল দিয়ে মাছ ধরা, কেউ বা টানা জাল দিয়েই মাছ ধরতো। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যদি উপচে উঠা প্লাবনে পুকুর ডোবা ডুবে যায় ঠিক তখনি সকল মাছ চলে যেতো মাঠে ঘাটে।

আর তখন সেই ছুট পড়া রুই কাতাল মৃগেল, বোয়াল বা হরেক রকম মাছ ধরতে উৎসবের মতো সবাই স্ব স্ব ঘরের মজুত থাকা জাল নিয়ে নেমে পড়তো কি যেন এক ভালবাসা ভাললাগা যেন মাছ ধরার উৎসব লেগে যেত তখন। যদিও যার পুকুরের মাছ চলে যেত তার মাথায় হাত হতো কিন্তু সেটাতেও কোন কষ্ট হতনা। আপ্রাণ চেষ্টা করতো হয়তো সেও দুচারটা মাছ বাগে আনার উৎসবে যোগ দিয়ে, এতে বর্ষা বা বন্যাদুর্গত হয়ে মন খারাপ কেটে যেত প্রায় সকলের।

আবার বড় কোন উৎসবে পুকুরে জাল দিয়ে মাছ তোলা তো এখনো অবশিষ্ট আছে। কিন্তু অনেক সংস্কৃতি এখন যেন দিনে দিনে বিলুপ্ত প্রায়। ভালুকায় উপজেলার বড় বড় হাট,মল্লিক বাড়ী, বিরুনীয়া, বাটাজোড়, ভরাডোবা, উথুরা, কাচিনা, রাজৈ ঝাল বাজারে জালের হাটও ছিল এক সময়। এখন দু-একটা দোকানে চিহ্ন থাকার মতো বেঁচে আছে এই সংস্কৃতি।

এদিকে বিগত দুই দশকে দেশের মাছ উৎপাদনের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে মৎস্য বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মোট উৎপাদনে দেশীয় মাছের অবদান ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে দেশি মাছের প্রজাতি বৈচিত্র্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আমরা আজকে পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয় দেশ মাছ উৎপাদনে, কিন্তু আমাদের যে সংস্কৃতি ছিল দেশিয় মাছে সেটা লুপ পেয়ে যাচ্ছে ক্রমশই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে যত প্রজাতির মিঠা পানির মাছ আছে, তার অর্ধেক কমে গেছে প্রতিবছর ৯ শতাংশ হারে মিঠা পানির মাছ এখন কমে যাচ্ছে। কমার এই হার যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছ বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ১২০ প্রজাতির দেশীয় মাছ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে বর্তমানে ২৯৬ প্রজাতির মাছ রয়েছে। এর মধ্যে মুক্ত জলাশয়ে রয়েছে ২৬০ প্রজাতির মাছ, ২৪ প্রজাতির। চিংড়ি। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার বা আইইউসিএন বলছে, বাংলাদেশে মোট ৫৪ প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।এর মধ্যে ১২ প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব চরম হুমকিতে বা মহাবিপন্নের তালিকায়, ২৮ প্রজাতির মাছ বিপন্ন তালিকায় আর ১৪ প্রজাতির মাছের অবস্থা সংকটাপন্ন।

তবে কৃষি বিশেষজ্ঞ যিনি কৃষকদের উন্নয়ন মূলক অনুষ্ঠান করে থাকেন এবং কৃষকদের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধার জন্য কাজ করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব উপস্থাপক শাইখ সিরাজ বলেন নানান মাছের জাতের বিপন্নতার দুঃসংবাদে হারিয়ে যাওয়া বেশ কয়েক প্রজাতির দেশি মাছের মধ্যে সম্প্রতি আবার মহাশোল, পাবদা, আড়, সিং, মাগুর, কৈ, চিংড়ি, গুজি, বিভিন্ন বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি। বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে এসব মাছ তথা জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণে ব্যাপক উদ্যোগ খুবই জরুরি। সর্বোপরি পুষ্টির উৎস ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যও দেশীয় মাছের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম৷

%d bloggers like this: