loading...

স্বরণ…… মৌলভী মোঃ আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী

0

অানোয়ার  হোসেন শাহীনঃ

মৌলভী মোঃ আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী,এম এল এ। বিশিষ্ট  রাজনীতিবিদ,কৃষক নেতা, সমাজসেবক।গত ৩রা নভেম্বর-২০১৮ইং ছিল ৫১ তমমৃত্যুবার্ষিকী।এই আলোচিত রাজনৈতিক ব্যাক্তিকে কেউ  মনে রাখেনি। তার স্বরণে অনুষ্টিত  হয়নি কোন স্বরনসভা। তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে  নেয়নি কোন উদ্যোগ। অথচ এই ব্যাক্তিটি  এসেম্বলিতে বাংলা ভাষা প্রচলন,ভাষা অান্দোলন,৬দফা অান্দোলন, বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তিসহ এলাকার সামাজিক উন্নয়নে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেন।

জন্ম পরিচয় :মৌলভী মোঃ আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী১৮৭৬ইং সনে তৎকালীন নেত্রকোনা মহকুমার জয়শিদ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পীরবংশে জন্মগ্রহণ করেন।  পিতা হযরত মুন্সি  মোঃ তকি ও মাতার নাম মেহেরুন্নেছা। পিতা হযরত মুন্সী মোঃ তকি ছিলেন একজন পীরে কামেল।  আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী ৭ভাই ও এক বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন।

শিক্ষা জীবন :তিনি তার একমাত্র বড় বোনের কাছে থেকে বর্তমান নেত্রকোণা জেলার পুর্বধলার খলিশাপুর প্রাইমারী স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর তিনি একই জেলার মদনপুর মাদরাসায় আরবীতে শিক্ষালাভ করেন। ১৮৯৮ সালে প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। সেখান থেকে তিনি চলে আসেন গৌরীপুর থানার বোকাইনগর গ্রামের অষ্টগড় প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা  যোগ দেন।  তিনি এই গ্রামে অবস্থিত হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারের কাছে একটি মক্তবে পড়াতেন এবং ধর্মসভা করতেন।

বিয়েঃ১৯১০সালে বোকাইনগর গ্রামের ফকির বাড়িতে শাহ্ মোঃ আবাল উদ্দিনের কন্যা ছফুরা খাতুনের সাথে বিবাহবন্ধনে অাবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনে তিনি ছিলেন ৫পুত্র ও ৪কন্যার জনক।

বোকাইনগরী উপাধী ধারণঃমৌলভী মোঃ আবদুল ওয়াহেদ  বোকাইনগরে অাগমনের পর সল্প সময়ে  গ্রামের  মানুষের  কাছে কর্মগুনে অাপন হতে  পেরেছিলেন। এলাকার   গুণমুগ্ধগণ ভালবেসে তাঁকে ‘বোকাইনগরী’ উপাধী প্রদান করে। ভালবাসার উপাধী তিনি আমৃত্যু কৃতজ্ঞচিত্তে লালন করেছিলেন।

রাজনীতি জীবনঃভারতবর্ষের  মুক্তির লক্ষে স্বাধীনতা চেতনায়  ধারণ করে১৯০৫সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে  জড়িয়ে পড়েন। শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক প্রজা পার্টির  কর্মি হিসাবে রাজনীতিততে যোগ দেন।  তাঁরই অনুসারী হয়ে একজন ভাল বক্তা হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করেন। রাজনীতি  একনিষ্টতার জন্য ভূয়সী প্রসংসা করেছিলন শেরে বাংলা। বক্তৃতা দেবার সময় তিনি প্রবাদ বাক্য ব্যবহার  করতেন। তিনি নানাগুণের অধিকারী ছিলেন। সহজবোধ্য  (শিমিশা- প্রবচন)  বক্তৃতায় ব্যাবহারে করে মানুষকে হাসাতেন,কাঁদাতেন ও সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করতেন।

আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী ১৯৩৬সালে কৃষক নেতা হিসাবে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে  লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে  নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে কলকাতার এসেম্বলির সদস্য হন। ওই এসেম্বলিতে তিনি বাংলায় বক্তৃতা দিতে শুরু করলে স্পীকার তাঁকে বাংলায় বক্তৃতা দিতে নিষেধ করেন। কিন্তু তিনি তা অগ্রাহ্য করে বাংলাতেই পুরো বক্তব্য দেন। এসেম্বলিতে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেবার অধিকার নিয়ে তিনি আন্দোলন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাঁর আন্দোলনে সাড়া দিয়ে এ আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। এ সময় তিনি কলকাতার  সদানন্দ পার্কের মাঠ,গড়ের মাঠে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করেন। এইভাবে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়ে জনমত গঠন করে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেবার অধিকার আদায়ের মাধ্যমে অান্দোলনের সফলতা অাসে।

তিনি ১৯৫৪ সালে নূরুল আমিনকে নির্বাচনে পরাজিত করে আওয়ামী মুসলিম লীগ (যুক্তফ্রন্ট) এর নৌকা প্রতীক নিয়ে  এমএলএ নির্বাচিত হন।১৯৫৪সালের মার্চ মাসে শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক যখন কৃষক পার্টিতে যোগদান করেন, তখন তিনিও কৃষক পার্টিতে যোগদান করেন।

১৯৫৮সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি বিভিন্ন সভায় যোগদান করে প্রচারাভিযান  নামেন।  তিনি  ময়মনসিংহ  জেলা কৃষক-শ্রমিক-প্রজা  পার্টির  সহ- সভাপতি  ছিলেন। পাকিস্তান  অামলে  অাইয়ুব শাহীর দমন নীতির বিরূদ্ধে    অগণতান্ত্রিক  শাসনতন্ত্র  ওবর্ধিত খাজনা, কর হ্রাস এবং খাদ্যর দাবীতে ঐক্যবদ্ধভাবে তৎকালীন অাওয়ামীলীগ, মুসলিম লীগ ওকৃষক- শ্রমিক- প্রজা পার্টির  যৌত উদ্যোগে  ১৯৬৩ খ্রি, ২৮ এপ্রিল  গৌরীপুর  বাজার ময়দান(বতর্মানে  হারুন পার্ক) তাঁর সভাপতিত্বে  বিশাল জনসভা অনুষ্টিত  হয়। উক্ত সভায় তৎকালীন ময়মনসিংহ  জেলা অাওয়ামীলীগের   সাবেক সভাপতি সৈয়দ  নজরুল  ইসলাম প্রধান বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন।

তাঁর সাথে প্রখ্যাত আইনজীবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভারতের মহাত্মা গান্ধীর সাথেও ছিল ঘনিষ্ট সম্পর্ক। তিনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথেও রাজনীতি করেছেন।

১৯৬৪ সালে গৌরীপুর কলেজ প্রতিষ্টায় বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিলেন বিধায় প্রতিষ্ঠাতাকালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।নারী শিক্ষায় গৌরীপুর বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্টায় তাঁর ভূমিকা স্মরণযোগ্য।

বিভিন্ন  গ্রন্থে বোকাইনগরীঃ

প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির ৫০বছর’, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ.এফ.এম আহসান উদ্দিন চৌধুরীর ‘স্মৃতি অমলিন’, লোক সাহিত্য বিশেষজ্ঞ ড. মাজহারুল ইসলামের ‘আমি স্মৃতি আমি ইতিহাস’ এবং প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ কমরেড মনিসিং রচিত ‘আমার জীবন সংগ্রাম’, কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘বাংলার চাষী’সহ বেশ কিছু পত্রপত্রিকা  অল ইন্ডিয়া গণতন্ত্র মঞ্চে তার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৪৪ সনে প্রকাশিত  Encyelopedia of Pakistan  গন্থে মৌলভী মোঃ আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরীর বনার্ঢ্য  রাজনীতির জীবন সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে।

মৃত্যুবরনঃ

১৯৬৭সালের ৩ নভেম্বর   গৌরীপুরের কিংবদন্তি  কৃতি পুরুষ, বিশিষ্ট সমাজ সেবক,প্রথিতযশা  রাজনীতিবিদ বাগ্মী, মৌলভী  মোঃ আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী, ৮৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।  অসাম্প্রদায়িক  বোকাইনগরীকে তাঁর প্রিয় বোকাইনগর নিজ বাড়িতেই  সমাধিস্থ করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ কাজী এম এ মোনায়েম  রচিত ‘ গৌরীপরের ইতিহাস ঐতিহ্য কিংবদন্তি ‘।

 

loading...
%d bloggers like this: