ঢাকা ৩৫°সে ৯ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বদলগাছীতে চোর সন্দেহে একব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ‘গণপিটুনি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা!

প্রতিনিধি বদলগাছী (নওগাঁ) ঃ
নওগাঁর বদলগাছীতে একটি গভীর নলকূপের বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার চোর সন্দেহে হেলাল হোসেন (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত রোববার রাত নয়টায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্রো চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। বদলগাছী সদর ইউনিয়ন পরিষদ ইউপির চেয়ারম্যান ও কয়েকজন মেম্বার ও তাঁদের লোকজন তাঁকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়ে গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে মারা গেছেন বলে প্রচার করা হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম মন্ডল আওয়ামী লীগ নেতা ও স্থানীয় সাংসদ ছলিম উদ্দিন তরফদারের আস্থাভাজন হওয়ায় পুলিশও ঘটনাটি ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে নিহতের স্বজনেরা অভিযোগ করেছেন।
নিহত হেলাল হোসেন উপজেলার কোলা ইউনিয়নের গয়রা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মৃত আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। তিনি বদলগাছী উপজেলা সদরের কলেজ পাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
বদলগাছী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্রার আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) রুহুল আমিন বলেন , হেলাল হোসেনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার দিবাগত রাতে বদলগাছী সদর ইউপির সাতগাছি আদিবাসী পাড়া গ্রামের ফসলি মাঠের বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি গভীর নলকূপের টান্সফর্মার চুরি হয়। পরেদিন রোববার একই গ্রামের একটি খড়ের গদার ভেতর ট্রান্সফর্মার চুরির কাজে ব্যবহৃত সরমাঞ্জাদী পাওয়া যায়। রোববার বেলা ১২ টার দিকে হেলাল হোসেন সাইকেলযোগে ওই গ্রামে এসে খড়ের গাদার আশপাশে ঘুরাফেরা করে সেখান থেকে চলে যান। তখন সারতি রানী পাহান নামে এক গৃহবধূ তাঁর ভাসুর সনজিত পাহানকে ঘটনাটি জানান। সনজিত পাহান গভীর নলকূপের অপারেটর ও সাবেক মেম্বার ভাতসাইল গ্রামের গোলাম মর্তুজা রেজা চৌধুরীকে মুঠোফোনে ঘটনাটি জানান। তার বিবরন অনুযায়ী রেজা চৌধুরী হেলাল হোসেনকে ভাতসাইল গ্রামের সড়ক থেকে ধরে তাঁকে সাতগাছি গ্রামে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে বিকেল চারটার দিকে গভীর নলকূপের অপারেটর গোলাম মর্তুজা রেজা চৌধূরী হেলাল হোসেনকে বদলগাছী ইউপির কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের জিম্মায় দেন। ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার ও তাঁদের লোকজনের মারপিটে হেলাল হোসেন মারা যান। তাঁরা এঘটনাটি ধামাচাপা দিতে গণপিটুনিতে মারা গেছেন বলে প্রচার করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ১০-১২ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওইদিন সন্ধ্যা ৬ টার দিকে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম ইউপি কার্যালয়ে আসেন। তখন তাঁর সঙ্গে কয়েক ইউপি সদস্য ও ইটভাটা মালিক সমিতি ও উপজেলা পুলিশিং কমিটির সম্পাদক খোরশেদ আলম, ও আওয়ামীলীগের সদস্য সানাউল হোসেন হিরো ছিলেন। তাঁরা হেলাল হোসেনকে ইউপির সভাকক্ষে নিয়ে তাঁর দুই হাত জানালার গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে ফেলেন। এরপর সভাকক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন। ট্রান্সফর্মার চুরির স্বীকারোক্তি আদায় করতে তাঁকে দুই ঘন্টার অধিক সময় ধরে দফায় দফায় নির্যাতন করা হলে হেলাল অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত ৮ টার দিকে ইউপি চেয়ারম্যান গ্রাম পুলিশ দেলোয়ার হোসেনকে দিয়ে হেলালকে হাসপাতালে পাঠান।
গ্রামপুলিশ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান আমাকে ডেকে হেলাল হোসেনকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। আমি হেলালকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। এবং হেলাল কিছুটা সুস্থ হলে হাসপাতাল থেকে তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আমার সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারাও ছিলেন শারীরিক অবস্থা খারাপ দেখে হেলাল হোসেনকে ওসি সাহেব গ্রহন করেননি। হেলালকে থানা থেকে আবার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে হেলাল হোসেন মারা যান।
ইউপি কার্যালয় সংলগ্ন পানের দোকানী মহিবুল ইসলাম বলেন, ইউপির সভাকক্ষে লোকটিকে প্রচুর মারধর করা হচ্ছিল। তখন লোকটি খুব জোওে জোরে চিৎকার করছিল।
বদলগাছী সদর ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম বলেন, হেলাল হোসেনকে সাতগাছি গ্রামের লোকজন গণপিটুনি দিয়েছিল। এরপর গ্রামবাসীরা তাঁকে ইউপি কার্যালয়ে এনেছিলেন। আমরা ইউপি কার্যালয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম। তখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। আমরা কেউই তাঁকে মারধর করিনি।
নিহত হেলালের বড় ভাই বেলাল হোসেন বলেন, বদলগাছী সদর ইউপির চেয়ারম্যান ও কয়েকজন মেম্বার ও তাঁদের লোকজন মিলে আমার ভাইকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছেন। এঘটনাটি ধামাচাপা দিতে গণপিটুনিতে আমার ভাই মারা গেছেন বলে প্রচার করা হচ্ছে। আমি আমার ভাইয়ের হত্যাকান্ডের বিচার চাই। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সরকারি দলের নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দিনের আস্থাভাজন হওয়ায় পুলিশ ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এ ঘটনায় মহাদেবপুর-বদলগাছী সার্কেল এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম এর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে থানায় ফিরে ইউপি চেয়রম্যান ও সাবেক মেম্বার গোলাম মর্তুজা রেজা চৌধুরী সহ ৩ জনের নিকট থেকে লিখিত জবানবন্ধি গ্রহন করেছেন। তবে মামলা রেকর্ড এর পর ডিপলি জিজ্ঞাসা বাদ করলে বিস্তারিত জানা যাবে।

এবিষয়ে থানার অফিসার ইনর্চাজ (ওসি) জালাল উদ্দীন জানান, হাসপাতালে হেলালের মৃত্যুর পর তিনি খবর পেয়েছেন। এর আগে হেলালকে ইউনিয়ন পরিষদে আটক রেখে তাকে মারপিট করা হচ্ছে বিষয়টি তিনি জানতেন না। তবে হেলালের পরিবারের লোকজন থানায় এসেছে এবং মামলার প্রস্তুতি চলছে। মামলা রেকর্ড শেষে হেলালকে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হবে।




আপনার মতামত লিখুন :

এক ক্লিকে বিভাগের খবর