রাজনীতির ‘নতুন মাঠ’ ডিজিটাল মাধ্যম

0

‘পাল্টায় মত, পাল্টায় বিশ্বাস, স্লোগান পাল্টে হয়ে যায় ফিসফাস, ফিসফাসটাও পাল্টে যেতে পারে, হঠাৎ কারও প্রচণ্ড চিৎকারে’- কলামটি লিখতে বসে শিল্পী কবীর সুমনের এ গানটি মনে ভেসে উঠল। তিনি এ গানটিতে পরিবর্তনের জয়গান গেয়েছেন। পৃথিবীতে শাশ্বত জিনিস খুব অল্প, সেই অল্পের একটি হচ্ছে পরিবর্তন; এটি টিকে থাকে।

এ গানে সেটারই যেন স্বীকৃতি দিয়ে সুমন বলেন, ‘দেখতে দেখতে সবই পাল্টে যায়’। দেখতে দেখতে সবই পাল্টে গেলেও আমরা কি সব পরিবর্তন আসলে গভীরভাবে খেয়াল করি? সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পদক্ষেপ নিই? সাধারণদের কথা বাদই দেই, অনেক সময় এ পরিবর্তন খেয়াল করতে কি ব্যর্থ হয় না বুদ্ধিমান এবং অভিজ্ঞরাও?

আড়াই হাজারের বছরের বেশি সময় আগে এথেন্সে গণতন্ত্রের যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটিও গেছে নানা পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। আজকে যেসব দেশে মোটামুটি আদর্শ গণতন্ত্র আছে, সেটিও এথেন্সের গণতন্ত্রের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। এথেন্সের শুধু জমির মালিক পুরুষ নাগরিকদের ভোটাধিকারের স্থলে এখন নারী-পুরুষ-শ্রেণি নির্বিশেষে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা ভোট দিতে পারে। আবার সেসময় যেভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নাগরিকরা সরাসরি ভোট দিতে পারত, সেটি বর্তমানের বিশাল জনসংখ্যার বাস্তবতায় আর সম্ভব হয় না।

এ পরিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী ছোঁয়া লেগেছে রাজনীতিতেও। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের কাজ হচ্ছে জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া। এ সংযুক্তির উদ্দেশ্য নিজ দলের চিন্তা, পরিকল্পনা জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া। মূল টার্গেট গ্রুপ যেহেতু তার চিন্তায়, মননে ক্রমাগত পাল্টে যেতে থাকে, তাই ‘কী বলা হবে’ সেটিও পরিবর্তিত হতে হয় দ্রুত। আবার মানুষের পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমও যেহেতু পাল্টে যায়, তাই কীভাবে সে যোগাযোগ হবে, সে প্রক্রিয়াটিও ক্রমাগত বদলে যেতে থাকে।

১০ বছর আগে আমরা কল্পনাও কি করেছি এ ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে একজন নির্বাচনী কৌশলবিদের আবির্ভাব হতে পারে, যাকে তার দলের পক্ষে কাজ করানোর জন্য বহু রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে? ৩৪ বছর বয়স থেকেই (এখন বয়স ৪৩) তার কাছে ধরনা দিতে থাকবে বহু বর্ষীয়ান, পোড় খাওয়া ঝানু রাজনীতিবিদকে? হ্যাঁ, আমি ভারতের প্রশান্ত কিশোরের কথা বলছি। ২০১১ সালে গুজরাটে নরেন্দ্র মোদির রাজ্য সরকারকে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করে বোদ্ধাদের দৃষ্টি কেড়েছিলেন তিনি।

এরপর ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে বিজেপির বিরাট বিজয় নিশ্চিতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পর সর্বসাধারণের মনোযোগে আসেন। এরপর একে একে বিহার রাজ্য নির্বাচন (২০১৫ সাল), উত্তর প্রদেশ রাজ্য নির্বাচন (২০১৭ সাল), অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচন (২০১৯ সাল) এবং সর্বশেষ দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে (২০২০ সাল) প্রশান্ত তার জাদু দেখিয়েছিলেন। রাজনীতি, রাজনীতির কৌশল এভাবেই পাল্টে যায় ক্রমাগত, যেটি অনুধাবন করতে হবে সব রাজনৈতিক দলকে।

মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ ‘আরব বসন্তে’র প্রভাবের বিশ্লেষণ নানাদিক থেকে হয়েছে। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রে এর মূল্যায়ন সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে ভবিষ্যতের জন্যও। একটি হচ্ছে, সঠিক সংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া একটি আপাত স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণের ফল আদতে দেশের জন্য মঙ্গলজনক হয় কি না, সেই প্রশ্ন। আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এ আন্দোলন ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষকে সংগঠিত করার সম্ভাবনার নতুন দ্বার আমাদের সামনে উন্মুক্ত করেছে।

ঠিক একইভাবে আমাদের দেশেও দুটি আন্দোলন- কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ডিজিটাল মাধ্যমের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার শহিদুল আলমের পরিণতি শুধু দেশ নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলও প্রত্যক্ষ করেছে। এ পরিবর্তনটা দেখা যাচ্ছিল তারও আগে থেকে; কিন্তু আরব বসন্ত আর আমাদের দেশের উল্লিখিত আন্দোলন দুটি একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরও কি আমরা এ পরিবর্তন যথেষ্ট অনুভব করছি?

রাজনীতিতে বহুল আলোচিত শব্দ হল ‘মাঠ’। কিছু রাজনীতিবিদকে আমরা ‘মাঠের রাজনীতিবিদ’ অভিধায় অভিহিত করি। আমরা বোঝাতে চাই, তিনি মানুষের সঙ্গে সশরীরে জনসংযোগ করেন, রাজপথে থাকেন এবং মিটিং-মিছিল করেন। পরিবর্তন বলছে রাজনীতিতে ‘মাঠ’ শব্দটি থাকবে; কিন্তু এটি দিয়ে এখন আর শুধু এ ভৌত মাঠটিকেই বোঝালে চলবে না, বোঝাতে হবে ডিজিটাল মাঠকেও।

একজন রাজনৈতিক কর্মী, যিনি টিভি টকশোতে দলের পক্ষে বিতর্ক করেন, মূলধারার মিডিয়ায় এবং সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করেন; মানুষের পক্ষে ও দেশের স্বার্থে কলমযুদ্ধে নেমে কলাম লেখেন; সেমিনার, গোলটেবিল আলোচনায় সমাজ, অর্থনীতি বা রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন তিনিও আসলে মাঠেরই কর্মী। তিনিও দলের পক্ষে লড়াই করে যান এবং সেই লড়াই মোটেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং নতুন বাস্তবতায় তা বহু ক্ষেত্রেই মানুষকে কানেক্ট করে অনেক বেশি আর তাই কোনো কোনো পরিস্থিতিতে এটি সনাতন মাঠের চেয়েও অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

খালেদা জিয়ার কারারুদ্ধ হওয়ার সময় থেকে শুরু করে মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তার মুক্তির দাবিতে সনাতন মাঠে তেমন কোনো কিছুই করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এ সময়টিতে ডিজিটাল মাঠে অনেকেই তাদের সাধ্যমতো লড়াই করেছেন। অনেকেই আবেগ দিয়ে, আবার কেউ কেউ তথ্য-উপাত্ত-যুক্তি দিয়ে খালেদা জিয়ার ওপর যে অন্যায় চলেছে, সেটি মানুষের সামনে ক্রমাগত হাজির করেছেন। জনগণের সামনে থেকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা আর তার ওপর অন্যায় কোনোটিই হারিয়ে যায়নি ডিজিটাল মাঠের অ্যাক্টিভিজমের কারণে।

শুধু খালেদা জিয়া হবেন কেন, দুর্নীতি-অনিয়ম সবকিছুর বিরুদ্ধে কথা বলে সেটি মানুষের সামনে জাগ্রত রাখার মতো খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন ডিজিটাল মাঠের কর্মীরা। বিতর্কিত সংসদ থাকার সময়টাতে সরকারি দলের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে টিভি টকশোতে সরাসরি বিতর্ক মানুষের সামনে বিরোধীদের অনেক শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ডিজিটাল মাঠের এ যুদ্ধও আসলে যুদ্ধই। অনেক ক্ষেত্রে এটি সনাতন মাঠের যুদ্ধের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নামের এক ভয়ংকর অস্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এ যুদ্ধ করতে হয়। অসংখ্য মানুষ এ আইনের কারণে মামলা এবং কারাবাসের শিকার হয়েছেন। অতি সমালোচিত এ আইনে নন-ডিজিটাল ক্ষেত্রের অপরাধের চেয়ে বেশি শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। খুব আলোচিত মানহানির মামলায় নন-ডিজিটাল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় উল্লিখিত অপরাধের সাজা হচ্ছে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড;

কিন্তু একই অপরাধ ডিজিটাল মাধ্যমের ক্ষেত্রে সংঘটিত হলে শাস্তি হচ্ছে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের চরম বিতর্কিত ২৯ ধারার (১) অনুযায়ী অনধিক ৩ বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়া। আর ২৯(২) অনুযায়ী একই ব্যক্তির একই অপরাধ আবার করার ক্ষেত্রে শাস্তি হচ্ছে অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লক্ষ টাকা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়া। নন-ডিজিটাল ক্ষেত্রে কৃত অপরাধের শাস্তির তুলনায় ডিজিটাল মাধ্যমে একই অপরাধের শাস্তির পরিমাণ বেশি রেখে সরকার প্রকারান্তরে এ মাঠের অন্তর্গত ক্ষমতাটারই এক ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছে। কয়েক বছর আগ পর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতাজুড়ে যে রাজনৈতিক কার্টুনগুলো দেখা যেত, সেগুলো এখন হারিয়ে গেছে।

যে গতিতে ডিজিটাল মাঠ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল, সেই গতিকে আরও কয়েকগুণ ত্বরান্বিত করে দিয়েছে করোনা সংকট। প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক পশ্চাৎপদ একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও করোনা আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য করেছে ডিজিটাল মাধ্যমে সংযুক্ত হতে। এ সংকট আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, ঘরে বসেও মানুষের সঙ্গে চমৎকার যোগাযোগ সম্ভব। এর একটি উদাহরণ হতে পারে বিএনপির দলীয় একটি অনুষ্ঠান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর এক আলোচনায় ১০ লাখ ভিউয়ারের তথ্য পেয়েছে বিএনপির অনলাইন যোগাযোগ শাখা।

তাই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিছুদিন আগে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাকে যথার্থভাবেই বলেন, ‘এখন আমরা জুম ব্যবহার করতে শিখে গেছি। অনেক নতুন অ্যাপ ব্যবহার করছি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করলে এক-দুই লাখ লোক জমায়েত হয়। অ্যাপসে আমরা এর চেয়েও অনেক বেশি লোক পাচ্ছি।’

সনাতন মাঠ আর ডিজিটাল মাঠ সম্পূরক নয়, অর্থাৎ একটি অনেক বেশি থাকলে আরেকটির প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না। এ দুটি মাঠ আসলে পরস্পরের পরিপূরক। একটির খামতি পূরণ করে অপরটি। তাই উভয় মাঠে যেসব কর্মী কাজ করবেন তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত।

রাজনৈতিক যোগাযোগের এ বিবর্তন গভীরভাবে অনুধাবন করে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে একটা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করে এ দুটি মাঠের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একজন রাজনৈতিক কর্মীকে উভয় মাঠে সমান মাত্রায় লড়াই করতে হবে না। দক্ষতার ধরন অনুযায়ী এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নির্ধারিত হবে। দুই মাঠে কারা কারা থাকবেন, কারা কারা লড়াই করবেন, সেটি নিয়ে একটি সঠিক নীতিমালা থাকতে হবে। যেহেতু ডিজিটাল মাঠটি অপেক্ষাকৃত নতুন এবং এটি সবার হাতেই আছে, তাই এটায় অ্যাক্টিভিজম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে দলের নীতি-আদর্শ-স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে। তাই এ মাঠে কাজ করার ব্যাপারে কিছু নীতিমালাও থাকা উচিত হবে। ডিজিটাল মাঠের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যবিকৃতি এড়িয়ে চলতে হবে।

প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অনুধাবন করা উচিত, রাজনৈতিক দর্শন এবং মতাদর্শ সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনের সঙ্গে যদি বিবর্তিত না হয়, তাহলে একটি রাজনৈতিক দল ভীষণ সংকটে পড়তে পারে। ঠিক তেমনি যুগের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তিত পদ্ধতি অবলম্বন করে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মিথস্ক্রিয়া নিশ্চিত করতে না পারলেও একই রকম সংকটে পড়বে রাজনৈতিক দলগুলো।

পরিবর্তন চোখের সামনেই হয়; কিন্তু সবাই ধরে ফেলতে পারে না এবং তা অনুযায়ী সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে না। বলা বাহুল্য, সেটি যারা পারে না, ভীষণ বড় মূল্য চুকাতে হয় তাদের। রাজনীতির নতুন ‘মাঠ’ রাজনৈতিক দলগুলোকে এ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।

%d bloggers like this: