যে ভাবে হয়েছিল বদলগাছী উপজেলার নাম ও বর্তমান পরিচিতি

0

 সানজাদ রয়েল সাগর বদলগাছী (নওগাঁ):

বদলগাছী উপজেলা সদরের কোল ঘেষে প্রবাহিত হয়েছে ছোট এক যমুনা নদী। এক কালে মানুষ জীবন জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন পন্য দ্রব্য নিয়ে এই নদীর কিনারে বসে পন্য দ্রব্যর বিনিময়ে অন্য রকমের পন্য দ্রব্য বদলা বদলি করে নিত। আর এই বিনিময় প্রথা ও বদলা বদলির নিয়মের মধ্যেদিয়ে বদল শব্দের সৃষ্টি। জুজুবি ট্রীজ (বরই) নামক এক প্রকার গাছের নাম অনুসারে গাছী শব্দের সৃষ্টি হয়। এরই সুত্র ধরে কালক্রমে এই উপজেলার নামকরন করা হয়েছে বদলগাছী।

উপজেলার পরিসংখ্যান সুত্র মতে জানা যায়, প্রাচীন কালে দেশে সামজিক অবস্থান সৃষ্টির আদি অন্তে মুদ্রা ব্যবস্থা প্রচলনের পূর্বে মানুষ যখন সভ্য সমাজে ফিরে আসে। তখন নিজের প্রয়োজনে এক জন আরেক জনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। এ সময় মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় অভাব অনটন চাহিদা পুরনে দেশে বিনিময় প্রথা ও দ্রব্য বদলা বদলীর নিয়ম চালু করা হয়। সে সময় এই এলাকার অধিবাসীরা দ্রব্য বদলা বদলীর অন্যতম স্থান হিসাবে বেছে নিয়েছিল এই ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম পার্শ্বের স্থানকে আর বর্তমান এই স্থানের নাম বদলগাছী ।

নদী পথে ও সড়ক পথে দূর দূরান্ত থেকে সহজেই এই স্থানে যোগাযোগ করা যেত। সে আমলে এখানে এই এলাকায় জুজুবি ট্রীজ (বরই) নামের এক প্রকার গাছ পাওয়া যেত। আর এ গাছ গুলি ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা হত। ঝোপঝাড়ে জমির ধারে এ ছাড়া যত্রতত্র প্রকৃতিগত ভাবে এ গাছ জন্ম নিত প্রচুর পরিমাণে। এ গাছের রস থেকে তৈরি হত চিনি। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী বদলা বদলি করে চিনি সংগ্রহের জন্য এখানে আসত। এভাবে বদলা বদলির প্রথা থেকে বদল ও জুজুবি ট্রীজ নামক গাছের নামনুসারে গাছী শব্দের সৃষ্টি হয়। এক কথায় বলা হত বদলগাছী।

বদলগাছীর কথা বললেই মানুষ সহজেই বুঝে নিত বদলা বদলির স্থান। দিনে দিনে এই স্থান বদলগাছী হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে এবং গড়ে উঠে এখানে হাটবাজার। তৎকালিন সময়ের প্রচলিত প্রথায় কালক্রমে এই উপজেলার নামকরন করা হয়েছে বদলগাছী। ১৭৫৭ খ্রীঃ এ দেশে তথা ভারত বর্ষ ইংরেজদের পদানত হলে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বদলগাছী তৎকালীন দিনাজপুর জেলার অধীন ছিল। ইতিহাস অনুসারে ১৮০৭ সালে বদলগাছী থানা হিসাবে এই স্থানটি স্বীকৃতি পায়। ১৮২১ সালে বদলগাছী থানা তৎকালীন বগুড়া জেলার অর্ন্তভুক্ত হয়। ১৮৮৭ সালে এই উপজেলাটি বৃহত্তর রাজশাহী জেলার অর্ন্তভুক্ত হয়। এ সময় বদলগাছী থানা নওগাঁ মহকুমার অধীন একটি সাধারন থানা হিসাবে পরিণিত হয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ১৯৮৩ সালে ৭ নভেম্বর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরনের ফলে বদলগাছী থানা আপগ্রেডেড উপজেলা হিসাবে রূপান্তরিত করা হয়।

এই উপজেলায় ১৯৮৩ সালে প্রথম নির্বাহী অফিসার হিসাবে যোগদান করেন মল্লিক মনসুর আহম্মেদ । ১৯৮৫ সালে মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৯০ সালে হাসেম রেজা চৌধুরী (টগর) উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। পরর্বতীতে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে ২০০৯ সালে আবু জাফর মোঃ সফি মাহমুদ ও বর্তমানে উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা অলি আহম্মেদ রুমি চৌধুরী দ্বায়িত্ব পালন করছে এবং বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হুসাইন শওকত।

বর্তমান উপজেলার আয়তন ও জন সংখ্যা, ৮ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলার আয়তন ২৩,১১১ বর্গকিলোমিটার। গ্রামের সংখ্যা ২৪৬টি। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক শুমারীর এক জরিপ অনুসারে উপজেলায় মোট বসত বাড়ী বা পরিবার সংখ্যা ৫৬,৩৪৫ টি। বর্তমান জনসংখ্যা ২ লক্ষ ১,৩৪২ জন। এর মধ্যে মহিলা ১ লক্ষ ৭৭৬ জন ও পুরুষ ১ লক্ষ ৫৬৬ জন। ইসলাম ধর্মের সংখ্যা ১ লক্ষ ৭৪,১৫০ জন, হিন্দু ১৯,৯৫৪ জন, বাকী সব বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ও আদিবাসী। মোট ভোটার সংখ্যা ১ লক্ষ ৪২,১৩৩ জন। সম্প্রতি নতুন ভোটার তালিকা প্রনয়নে আরও ৯ হাজার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে মহিলা ৪৫.৫% এবং পুরুষ ৫২.৬%।

এ উপজেলায় অবস্থিত,  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৩৪ টি, হাই স্কুল ৩২ টি, নিম্ন মাধ্যমিক ৪ টি, কারিগরি স্কুল ১ টি, জেনারলে কলেজ ৫ টি, কারিগরি কলেজ ৫ টি, দাখিল, আলিম ও ফাজিল মাদ্রাসা ২০ টি। এর মধ্যে বদলগাছী সরকারি ডিগ্রী কলেজের নাম পরিবর্তন করে বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সরকারি মহাবিদ্যালয় নামে কলেজটির নাম রুপান্তরিত করা হয়েছে ।

অপরদিকে এই উপজেলায় রয়েছে ১টি সরকারি হাসপাতাল , ১৮টি হাট-বাজার,৬টি ব্যাংক , ১৩টি পোষ্ট অফিস,  থাকার জন্য রয়েছে  ১ টি জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ও ১টি নদী।

এই উপজেলায় এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বৃহত্তম প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন ঐতিহাসিক বৌদ্ধ বিহার পাহাড়পুর অবস্থিত। এ ছাড়াও রয়েছে হলুদ বিহারে ঐতিহাসিক প্রাচীন বিহারের বৌদ্ধ ধ্বংসস্তুপ। এই দিক থেকে এই উপজেলাটি ঐতিহাসিক উপজেলা হিসেবে পরিচিত। কৃষি প্রধান এই উপজেলা নওগাঁ জেলার ১১ টি উপজেলার মধ্যে কাঁচামাল উৎপাদনে বিখ্যাত এলাকা হিসেবে পরিচিত।

%d bloggers like this: