ময়মনসিংহে সালিশে দম্পতির মাথা ন্যাড়া, গলায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ

0

মাসুদ রানা, ময়মনসিংহ:

ময়মনসিংহে ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় মুসলিম পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় এক হিন্দু দম্পতিকে মাথা ন্যাড়া করে জুতার মালা পরিয়ে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে গ্রাম সালিশি বৈঠকের মাতব্বরা । এমন ঘটনায় ঘটেছে, উপজেলায় রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের হাতিলেইট বিলপাড়া গ্রামের কয়েস চন্দ্র বর্মণ (৩৫) ও ল²ী রাণী বর্মণের (৩০) দম্পতির বাড়ীতে। জানা গেছে, গত বুধবার ( ১২ এপ্রিল ) রাতে ঘটনাটি ঘটেছে । ঘটনাটি যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে গোটা উপজেলাসহ বিভিগীয় পর্যায়েও।add

স্থানীয়রা জানায়, চন্দ্র বর্মণের দম্পতির সঙ্গে পাশের পাড়ার এক মুসলিম পরিবারের সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক থাকার কারণে হিন্দু স¤প্রদায়ের মাতব্বররা গ্রাম সালিশে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এসময় মাতব্বররা দেড়শ’ মানুষের উপস্থিতিতে স্বামী-স্ত্রীর মাথা ন্যাড়া করে দেয়। এরপরেও মাতব্বররা ক্ষান্ত হয়নি। ওই দম্পতিদের পিটুনি দিয়ে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় গুরিয়েছে। তাতেও মাতব্বরদের রাগ কমেনি। জরিমানা করা হয়েছে আরো ৪০ হাজার টাকা। এতেই ক্ষান্ত হয়নি সালিশ কারকরা। ওই পরিবারকে একঘরে করে রাখা হয়েছে বলেও গ্রামে অভিযোগ উঠেছে। এবিষয়ে সরজমিনে প্রতিবেদক ওই দম্পতির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন এসব তথ্য। অন্যদিকে জন প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা সালিশ কারকদের দ্রুত গ্রেপ্তারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। কয়েস চন্দ্র বর্মণ (৩৫) ও ল²ী রাণী বর্মণের (৩০)-এর ৪ সদস্যের হতদরিদ্র এই পরিবারটি নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তবে এই দম্পতির সংসারে দুটি মেয়ে সন্তানও রয়েছে। তাদের বড় মেয়ে বৃষ্টি বর্মণের বয়স ১০ বছর। ছোট মেয়ে বিউটি বর্মণ প্রতিবন্ধী তার বয়স ৮ বছর।

ADD Carcularএই হতদরিদ্র পরিবারটি হাতিলেইট বিলপাড়া গ্রামের আদিবাসী বাসন্দিা। সেখানে মান্দাই সমপ্রদায়ের দেড় শতাধিক পরিবারের বসবাস রয়েছে। নৃ জনগোষ্ঠীর মিত্র মোহন বর্মণের পুত্র কয়েস বর্মণ। এক বছর আগে পাশের বাক্কুর চালা গ্রামের ইবি’র আলীর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয় কয়েস বর্মণের। এ সুবাধে একে অপরের বাড়িতে মাঝে মধ্যেই যাওয়া-আসা করেন। গত বুধবার ( ১২ এপ্রিল) দুপুরে ল²ী রাণী বর্মণ, ইবির আলীর বাড়িতে বেড়াতে যায়। ঘটনাটি জানা জানি হলে মান্দাই পাড়ার মাতব্ববরা ক্ষিপ্ত হয়। এসময় রাতেই চন্দন বর্মণ, রূপচান, নরেন, পাইলট, পরেশ, কালি মহন বর্মণসহ মাতব্বররা মিত্র মোহন বর্মণের বাড়িতে সালিশ ডাকে। সালিশে ল²ী রাণীর বিরুদ্ধে ইবির আলীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ তোলা হয়। দীর্ঘ সালিশ বৈঠকে অভিযোগের সত্যতা পায়নি। তবুও মাতব্বররা সালিশের রায় দেন।

পরে কয়েস বর্মণ ও ল²ী রাণী বর্মণকে লাঠিপেটা ও জুতাপেটা, উভয়ের মাথা ন্যাড়া ও ল²ী রাণী বর্মণকে জুতার মালা পরানোসহ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সালিশে পাইলট বর্মণ, নরেশ বর্মণ ও চন্দন বর্মণসহ আরো ৩ থেকে ৪ জন স্বামী-স্ত্রীর মাথা ন্যাড়া করে মারপিট করে জুতার মালা পরিয়ে রাখে। তবে জরিমানার ৪০ হাজার টাকা সোমবার ( ১৮ এপ্রিল) এর মধ্যে না দিলে গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হয় মাতব্বররা। এদিকে কয়েস বর্মণ সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের, তিনি বলেন, আমার সঙ্গে পাশের পাড়ার ইবির আলীর বন্ধত্বের সম্পর্ক রয়েছে। সেই সুবাধে আমার বাড়িতে আসে এবং আমার স্ত্রীকে বোন হিসেবে মানে। কয়েস আরো জানায়, গত ১৮ বছর সংসার জীবনে আমি আমার স্ত্রীকে চিনি। আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছিল। সালিশে প্রমাণও করতে পারেনি মাতব্বররা।

তারপরও পরিবারের উপর একটি কলঙ্কের ছাপ লাগিয়ে দিলো। এবিষয়ে কয়েসের স্ত্রীর ল²ী রাণীর সাথে কথা হয়, তিনি জানায়, মাতব্বররা আমাকে মাথা ন্যাড়া করে জুতার মালা পরিয়ে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং পাঁচ গ্রামের লোকজনকে খাওয়ানোর জন্য ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। তিনি প্রতিবেদককে আরো জানান, তার অসুস্থ্য স্বামীকে চিকিৎসার জন্য ডাক্তার আনতে পারছে না, ঘরের বাহিরে কাজের জন্য যেতে দেয়া হচ্ছে না, সমাজপতিদের নির্দয় নির্মম শাস্তিতে অসহায় তারা। তাদের ঘরে বৃষ্টি (১১) ও প্রতিবন্ধী বিউটি (৭) কে নিয়ে ৪জনের সংসার। একমাত্র উপার্জনক্ষম কয়েস । খেয়ে, না খেয়ে কোন মতে সংসার চলে। কিন্তু তাদের জন্য ৫০হাজার টাকা জরিমানা দেয়া অনেক কঠিন ব্যাপার। তবে এ সমাজে থাকতে চাইলে টাকা যে দিতেই হবে, ঐ পরিবারের একমাত্র সম্বল গাভীটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

তবে ইবির আলী সাথে যোগাযোগ করা হলে ফোনে তাকে পাওয়া যায়নি। এদিকে উপজেলার ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন সভাপতি লুইচ জেংচাম বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রমান ছাড়া চুড়ান্তভাবে কাউকে এরকম শাস্তি দেয়া ঠিক না। এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্গন। এবিষয়ে ফুলবাড়ীয় থানার অফিসার ইনচার্জ ( ওসি) রিফাত খান রাজিব জানান, আমি ঘটনাটি শুনেছি, সাথে সাথেই পুলিশ পাঠিয়েছি, তদন্ত করে অবশ্যই আইনুনাগ ব্যবস্থা নিবো। অন্যদিকে, সালিশের এক মাতাব্বর নবীন বর্মণ প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের নিয়ম অনুযায়ী তাদের বিচার এবং জরিমানা করা হয়েছে। এসময় প্রতিবেদক বলেন, আমরা শুনেছি সালিশে অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি, তাহলে কেন এই দম্পতিকে এমন শাস্তি দেয়া হলো জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে আরো বলেন, অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি আমরা শুনেছি। এবিষয়ে কয়েস বর্মণের পিতা মিত্রমোহন বলেন, আমার বাড়িতেই সালিশ করে, আমার ছেলে-স্ত্রীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা সালিশে প্রমাণ করতে পারেনি। তারপরও এভাবে শাস্তি দেয়া হয়। স্থানীয় ইউপি সদস্য সেকান্দর আলী বলেন, ঘটনাটি ঘটনার পরের দিন শুনেছি, তবে ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক।

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা মহিলা পরিষদের সভানেত্রী পারভিন আখতার রেবা বলেন, ঘটনাটি খুবই ন্যক্কারজনক, মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

%d bloggers like this: