loading...

ময়মনসিংহে শীত এলেই দেখা মেলে ভিন্ন স্বাদে ভাঁড়ের ‘ঘটি গরম’ চানাচুর বিক্রি

0

মাসুদ রানা, ময়মনসিংহঃ

গায়ের পোশাকটি সার্কাসের ভাঁড় বা সঙ এর মতো দেখতে। সার্কাসে কৌতুক করে হাস্যরসের মাধ্যমে দর্শকদের আনন্দ দেন ভাঁড়রা। কিন্তু এই ভাড়ের উদ্দেশ্য অন্যরকম, যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তারা হলেন চানাচুর বিক্রেতা । মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলে ক্রেতা পাওয়া যায় অনেক বেশি। তাই এই বেশ ধারণ করে রাস্তায় পায়ে হেটে বিক্রি করছে গরম চানাচুর। ময়মনসিংহে শীত এলেই দেখা মেলে এই ‘ভাঁড়’দের। তারা যে চানাচুর বিক্রি করেন, তা ‘ঘটি গরম’ নামে ময়মনসিংহে পরিচিত।

চানাচুরের মাঝে একটি সিলবারের ঘটিতে কাঠ কয়লা বা তুষের আগুন জ্বালানো থাকে। তাই এর পাশের চানাচুর থাকে গরম। শীতের সন্ধ্যায় হালকা গরম চানাচুর খাওয়ার মজাই আলাদা। তবে যারা এই ভাঁড়’দের চানাচুর খেয়েছেন। জানবেন কেবল শুধু মাত্র তারাই। ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যা নামতেই দেখা মেলে ভাঁড় বেশধারী ‘ঘটি গরম’ চানাচুর বিক্রেতাদের। ঝুনঝুনি আর উচ্চস্বরে হাঁক দিয়ে চানাচুর কেনার আহবান জানান তারা। পেঁয়াজ-মরিচে মাখা চানাচুরের চাইতে এর স্বাদ মোটেও কম নয় জানান ক্রেতারা । এই চানাচুর বিক্রেতাদের পোশাকে নানা ধরণ ঢং আছে। মুখে পাউডার, ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে বের হন তারা। হলুদ আর লাল রং এর পোশাকটাও কিন্তু কিমাকার। সেই সঙ্গে চানাচুর খেতে আহবান জানানো বক্তব্যটাও আকর্ষণীয় হয়।

একটু টান দিয়ে হালকা সুরেলা ডাক উপেক্ষা করা কঠিন। ঘটি গরম চানাচুর বিক্রেতা ইদ্রিস মিয়া জানান, তার বাপ দাদাও এই ঘটি গরম চানাচুর বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, ‘মাইনষে আমরার মুহের দিকে চায়। এর লাইগ্যা মেকআপ মারি। ঝুনঝুনির শব্দ হুনলেই মাইনষে দৌড়ায়া আমার কাছে আয়ে। হাইঞ্জারতে (সন্ধ্যা) রাইত পর্যন্ত বেইচ্চা বাড়ী যায়।’

এই বিক্রেতা আরো জানান, এই চানাচুরগুলো বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। ডাল দিয়ে নিজেরাই তৈরি করেন। একেক দিন বিক্রি হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। খরচ বাদে পাঁচ থেকে ছয়শ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। যে টাকা উপার্জন হয় তাদিয়েই সংসার চলে যায় তাদের। ভোজন রসিক বাঙালির চানাচুর বস্তুটি বড় সমঝদার। হাটে-বাজারে বিভিন্ন গোত্র বর্ণের চানাচুর দেখা মেলে। চায়ের সঙ্গে, মুড়ির সঙ্গে, এমনকি নিঃসঙ্গেও এর মজা জাস্ট আনপ্যারালাল! শহর কিংবা গ্রাম সর্বত্রই একটি বিশিষ্ট বাঙালি চানাচুর ব্র্যান্ড! প্রত্যেকটির স্বাদ অন্যটির চেয়ে আলাদা, গোত্রে অভিন্ন।

কুটিরশিল্পের কদর থাকলেও চানাচুর অবহেলিত, অসংগঠিত একটি ক্ষেত্র। অনেকেই আছেন যাদের কর্মজীবন শুরু এই চানাচুর বিক্রি দিয়ে। পরে তারা আরও কুলীনতর ব্যবসার সন্ধান পেয়ে চানাচুরের ঠোঙাটি দূরে সরিয়ে রাখেন। তবে শুধু চানাচুর বেচে আইকন হয়ে উঠেছেন, এমন উজ্বল দৃষ্টান্ত অঞ্চলভেদে দেখা যায়। শপিংমল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সিনেমা হল, মিটিং এর আসরে দেখা মেলে খোলা চানাচুর বিক্রেতাদের। দোকানে বিক্রি হয় ব্র্যান্ডের চানাচুর। উজ্জ্বলার বা ভ্রাম্যমাণ হকারদের চানাচুর ক্রেতারা লাইন দিয়ে কেনেন। চানাচুর বহুরূপে হৃদিবিরাজে এই সুস্বাদু আহার। অনেক ব্র্যান্ডের চানাচুর আছে যা ঘরে ঘরে আদৃত। তবে ময়মনসিংহে ‘ভাঁড়’দের ‘ঘটি গরম’ চানাচুরের সফল ব্যাবসা হচ্ছে। অন্যদিকে একদা অফিস ফেরত বাঙালির প্রিয় স্ন্যাকস ছিল এই চানাচুর। সারা দিনের বিস্বাদ ভুলে মুখে স্বাদ আনত এই মুখরোচক বস্তুটি। বড় বাটিতে মুড়ি, পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ সহযোগে সে টিফিনের চল এখনকার যুগে আর তেমন দেখা যায় না। তারপরও হারিয়ে বা হেরে যায়নি খাবারটি।

loading...
%d bloggers like this: