ভ্যানের প্যাডেলে তিথির জীবনযুদ্ধ

0

লোকলজ্জা, সমাজের মানুষের মুখ বাঁকানো কথা, পিছুটান কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তিথিকে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে নাকি কিছুই আর করার থাকে না দেয়াল ভাঙা ছাড়া। সেই দেয়াল ভেঙেই সামনের দিকে এগিয়ে চলছেন তিথি। জীবনের জন্য যুদ্ধ, জীবন বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ, সেই যুদ্ধের সৈনিক এখন তিথি। সমাজ, সমাজপতি নেতা এবং নারীবাদী সংগঠনগুলোর কেউই যখন তিথি এবং তিথির পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি, তখন জীবন-জীবিকার জন্য হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে তিথি মানুষ পরিবহনের হ্যান্ডেল।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামের পিচঢালা পথের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাতায়াত করেন তিথি। মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছান। ভ্যানের প্যাডেলে নারীদের পা না মানালেও তিথির পায়ের নিচে এখন সেই প্যাডেল শোভা পাচ্ছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি অনেক পরিশ্রমের ওই কাজটি শেষ পর্যন্ত পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

ঘরে তার অসুস্থ মা। তিনবেলা ঠিক মতো খাবার খেতে না পারার যন্ত্রণার পাশাপাশি ওষুধ-পথ্য সবকিছু তিথির মাথায় চিন্তা হয়ে সারক্ষণ ঘোরে। বাবার অনুপস্থিতি মায়ের জন্য আরও বেশি বেদনার কারণ হয়েছে। অসুস্থ হয়ে কিছু দিন আগে তিথির বাবা মারা যান। মায়ের শরীরের অবস্থা সেই থেকে আরও খারাপের দিকে। ঘর থেকে বের হলে মায়ের সেবা করার কোনো মানুষ থাকে না। আর তিথি ভ্যান নিয়ে রাস্তায় না নামলে খাবারের জোগার হয় না। বড় ভাইয়েরা বিয়ে করে নিজের সংসার নিয়ে আলাদাভাবে ব্যস্ত। মা-বোনকে দেখাশোনা করে না কেউ। বাধ্য হয়ে মাকে বাঁচাতে নিজে বাঁচতে তিথি এখন ভ্যান ড্রাইভার।

জীবনযুদ্ধের সংগ্রামী তরুণী তিথি বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার রনবাঘা এলাকার বাসিন্দা। তিনি ওই এলাকার মৃত ইয়াকুব আলীর কন্যা। তিথি প্রতিদিন নন্দীগ্রাম ও নাটোরের সিংড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার রাস্তায় অটো-ভ্যান চালান।

এখন তার স্বামী নিয়ে সংসার করার কথা। কিন্তু তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে রোজগার করার মতো কেউ নেই। তাই বাধ্য হয়েই তিথি জীবিকা নির্বাহ করার পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন অটো ভ্যানচালকের পেশা। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা রোজগার করেন তিথি। রোজগারের অর্ধেক টাকা দিতে হয় অটোভ্যান মালিককে। বাকি টাকায় কোনো রকম চলে তার পরিবার। পারিবারিক অসচ্ছলতায় তিথি লেখাপড়া করতে পারেনি। যার ফলে কোনো অফিস বা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুযোগও নেই তার। অপরদিকে গ্রামে মানুষের বাড়িতে বছরের সব সময় তেমন কাজও থাকে না। সবদিক চিন্তা করেই তিথি হাতে তুলে নেয় ভ্যানের স্টাইকার। তিন চাকা ঘুরিয়ে রাস্তা পাড়ি দেন।

প্রত্যেক নারীর স্বপ্ন থাকে নিজের একটা সংসার হবে। স্বামী-সন্তান নিয়ে সামাজিকভাবে জীবন করবে। তিথিরও তেমন স্বপ্ন চোখের চারিদিকে ঘুরপাক খায়। নিভৃত রাতের অন্ধকারে টলটলে চোখে পানি ঝরিয়ে তিনিও তেমনটাই ভাবেন। কিন্তু বাস্তবতা তার সেই স্বপ্নকে আঁধারে ঢেকে দিয়েছে। সকালের সূর্য আকাশে ওঠার আগেই তাকে রাস্তায় নামতে হয় যুদ্ধ করতে। দিন শেষে পরাজিত সৈন্যের মতো শরীরে ঘাম মুছতে মুছতে বৃদ্ধ মায়ের ঘরে ফিরে আসেন। এভাবেই কাটছে তরুণী তিথির দিনকাল।

তিথির সাথে কথা বললে তিনি , প্রতিদিন নন্দীগ্রাম উপজেলার রনবাঘা বাজার থেকে সিংড়া উপজেলার বোয়ালিয়া বাজার পর্যন্ত অটোভ্যান চালান তিনি। অটোভ্যানটি তিনি ভাড়া নিয়ে চালান। ফলে রোজগারে একটা বড় অংশ ভ্যানের মালিককে প্রতিদিন পরিশোধ করতে হয়। তিনি জানান, অভাবের কারণে লেখাপড়া শেখা হয়নি তার। তাই ছোটখাট কোনো চাকরি পাওয়ার আশাও নেই তার। সে কারণে জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য বেছে নিয়েছেন এই পেশা। নিজের সংসার করার কথা বললে চোখ ভরা পানি নিয়ে বলেন, সংসার প্রতিটি নারীর জীবনে একটি স্বপ্ন। আমারও স্বপ্ন আছে সুন্দর একটি স্বচ্ছল সংসার করার। তবে একটি অটোভ্যানের মালিক না হওয়া পর্যন্ত ওসব নিয়ে ভাবছি না। নিজের একটি অটোভ্যান হবে বৃদ্ধা মায়ের সংসারে অভাবের দিন শেষ হবে এজন্য সারাদিন পরিশ্রম করছি।

তিথি সংগ্রামী জীবনযাপন করছেন। তিনি পুরুষের সাথে সমান তালে ভ্যান চালিয়ে রোজগার করে। ভ্যান চালানোর পাশাপাশি তিনি গ্রামে বিভিন্ন কাজও করেন। বৃদ্ধা মায়ের সংসারের অভাব মোচন করার জন্য এ আত্মপ্রত্যয়ী বালিকা জীবনযুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছেন।

তিথির সংগ্রামী জীবনের পার্ট হিসেবে তার পাশে এখনও সমাজের বিত্তবান, সমাজপতি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অথবা কোনো এনজিও দাঁড়ায়নি। সুবিধা বঞ্চিত মানুষের তালিকা কাজে লাগিয়ে এনজিওগুলো আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেও তিথিদের জীবনে সেই ছোঁয়া কখনোই লাগে না। তিথির এখন টার্গেট একটি ভ্যানের মালিক হওয়া। এছাড়া আর সব স্বপ্ন তিথির চোখ মুখ থেকে মুছে গেছে।

%d bloggers like this: