বান্দরবানে ভিডিও কনফারেন্সে দেশের ইতিহাসে প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ

0
মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম: বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি: 
বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে প্রথমবারের মত ভিডিও কনফারেন্সিং অ্যাপস জুম ব্যবহার করে বান্দরবান পার্বত্য জেলার চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একজন চিকিৎসক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকাল ০৩:৩০ ঘটিকা হতে ০৪:২০ ঘটিকা পর্যন্ত বান্দরবান পার্বত্য জেলার অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুনের আদালত এই সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, “আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০” এর ৩-ধারায় বর্ণিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন জি.আর.-৮২/১৮ (রাষ্ট্র বনাম মোঃ কামাল উদ্দীন গং) মামলাটিতে ২৫/০৩/২০১৮ খ্রিঃ তারিখ রাত ২:৩০ ঘটিকা হতে ০৩:৩০ ঘটিকার মধ্যে ভিকটিম ইজ্জত আলী এবং নাসিমা আক্তারকে চিকিৎসা প্রদান করেছিলেন বান্দরবান সদর হাসপাতালে কর্মরত তৎকালীন আরএমও ডাঃ মোঃ মাজেদুর রহমান। বদলিসূত্রে বর্তমানে তিনি দিনাজপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার পদে কর্মরত রয়েছেন। বিগত ০২/০৪/২০২০ খ্রিঃ তারিখ চিকিৎসক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য্য করলেও তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। মামলাটির সাক্ষ্য পর্যায় শুধুমাত্র চিকিৎসক সাক্ষীর সাক্ষ্যের জন্য সমাপ্ত করা সম্ভব হচ্ছিলো না। পরবর্তীতে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে সুদূর দিনাজপুর থেকে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সাক্ষ্য প্রদানের জন্য উপস্থিত হওয়া কষ্টদায়ক, ঝুঁকিপূর্ণ এবং মামলায় বিলম্বের কারণ হতে পারতো। কিন্তু, আদালত “আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০” এর অধীনে ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় দ্রুততম সময়ে চিকিৎসক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোঃ শামীম হোসাইন জানিয়েছেন, ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত হলে চিকিৎসক সাক্ষী, অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী, রাষ্ট্রপক্ষে সিএসআই এর ইমেইলে জুম অ্যাপসের মিটিং এর তারিখ, সময় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক সাক্ষীকে স্ক্যান করে ই-মেইলে ইনজুরি সনদ প্রভৃতি প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে সাক্ষীর সাক্ষ্যে ইমেইলের মাধ্যমে স্বাক্ষর গ্রহণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। চিকিৎসক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আজ এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায় সমাপ্ত হয়েছে এবং অভিযুক্তদের ৩৪২ ধারায় পরীক্ষার জন্য দিন ধার্য্য করা হয়েছে।
“আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন,২০২০”  আইন ব্যবহার করে সাক্ষ্য গ্রহণকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অভিযুক্তপক্ষের আইনজীবী এবং বান্দরবান জেলা বার এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোঃ খলীল।
আইনজীবী মোঃ খলীল ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকমকে বলেছেন- এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে বেগবান করবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদূর দিনাজপুর থেকে এই সাক্ষীর উপস্থিত হতে অনেক সময় লাগতো। ফলে, মামলার বিচার নিষ্পত্তি বাধাগ্রস্থ হতো। অভিযুক্তদেরকে চিকিৎসক সাক্ষীর সাক্ষ্য সমাপ্ত হওয়ার জন্য অনেকগুলো তারিখ ধরে অপেক্ষা করতে হতো। যে উদ্দেশ্যে “আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০” প্রণয়ন করা হয়েছে সে উদ্দেশ্যেই আদালত কর্তৃক আইনটি প্রয়োগ করে ডাক্তার সাক্ষীর ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। এটি অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে অবশ্যই বাংলাদেশের সকল আদালত কর্তৃক এই আইন প্রয়োগ সময়োচিত হবে।
তিনি আরো বলেন- সাক্ষ্য গ্রহণকালে আমি কোন সমস্যা অনুভব করিনি। আদালতে আমরা যেভাবে কাজ করি সেভাবেই এই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত, পুলিশসহ সকলের উপস্থিতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে, এই ধরণের কার্যক্রমের সফলতার জন্য আদালতকে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা দিয়ে প্রস্তুত করা প্রয়োজন এবং সাক্ষ্য গ্রহণকালে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহারের কারণে মাঝে মাঝে অসুবিধা হচ্ছিলো বলে তিনি স্বীকার করেন। ইতিহাসের অংশ হতে পেরে তিনি গর্বিত এবং ভবিষ্যতেও এই ধরণের ক্ষেত্রে আদালত কর্তৃক ভার্চুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত মর্মে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। চিকিৎসক সাক্ষীর নিকটাত্মীয় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আইসিইইউ-তে চিকিৎসাধীন থাকা স্বত্ত্বেও সাক্ষ্য প্রদান করায় তিনি ডাঃমোঃ মাজেদুর রহমানকে ধন্যবাদ জানান।
এই বিষয়ে ডাঃ মোঃ মাজেদুর রহমান বলেন, আমার কর্মস্থল বিবেচনায় বান্দরবানের আদালতে উপস্থিত হওয়া অনেক কষ্টসাধ্য ছিলো। দিনাজপুর থেকে বান্দরবানে পৌঁছাতে আমাকে ১৬/১৮ ঘন্টা ভ্রমণ করতে হতো। আবার ফিরেও আসতে হতো। তার পরিবর্তে আদালত আমার সাক্ষ্য আমাকে দিনাজপুরে হাসপাতালে রেখেই নিয়েছেন। এই কোভিড পরিস্থিতিতে আমাকে দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হয়নি। আমি হাসপাতালে আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেই সাক্ষ্য প্রদান করেছি। ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য প্রদান করা আমার জন্য আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা ছিলো। মামলা সংশ্লিষ্ট সকলেই ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলো। আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করার মতো বিষয় ঘটেনি। যথাসময়েই সাক্ষ্য প্রদান করেছি। সুতরাং, আমাদের বিচার ব্যবস্থায় ডাক্তার সাক্ষী হিসেবে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সাক্ষ্য প্রদান করা আমার জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা। আমার একজন নিকটাত্মীয় মরণাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন। এই অবস্থায় হয়তো আমি সাক্ষ্য প্রদান করতে যেতে পারতাম না। কিন্তু, ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য প্রদান করতে পারায় পরিবারের দুঃসময়েও আমি পাশে থাকতে পারছি। এভাবে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আদালত সংশ্লিষ্ট সকলেই ধন্যবাদ পেতে পারেন।
এই বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলার সিভিল সার্জন অং সুই প্রু মার্মা বলেন, ভিডিও কনফারেন্সে চিকিৎসক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে খুব ভালো উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট ডাক্তার দিনাজপুর থেকে আসতে যেমন কষ্ট হতো তেমনি সাক্ষ্য প্রদানের জন্য তার অনুপস্থিতিতে বেশ কয়েকদিন তার চিকিৎসা সেবা থেকে মানুষ বঞ্চিত হতো। কোভিড পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা হওয়ায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ডাক্তারদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা গেলে চিকিৎসা সেবায়ও কোন ব্যাঘাত ঘটবে না। আবার,কর্মস্থলে বসে বাংলাদেশের যে কোন আদালতে সাক্ষ্যও প্রদান করা যাবে। বিচার ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার এটি নিঃসন্দেহে অনন্য সুযোগ।
তিনি আরো বলেন-এভাবে সাক্ষ্য নেওয়ায় সরকারী  অর্থও সাশ্রয় হয়েছে। এই  ডাক্তার সাক্ষী দিনাজপুর থেকে বান্দরবান আসা যাওয়ার জন্য ১৫/২০ হাজার টাকা টিএ ডিএ পেতেন। ভিডিও কনফারেন্সে এভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ করায় এই অর্থ সাশ্রয় হয়েছে। আমি আশা করবো অন্যান্য আদালতও এই উদাহরণ অনুসরণ করবেন। এই ব্যবস্থায় ডাক্তার সাক্ষীরা দ্রুত সাক্ষ্য দিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। ফলে, চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হবে না
প্রসঙ্গত, অডিও ভিডিও বা অনুরূপ কোন মাধ্যমে ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করে বিচারাধীন দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, দরখাস্ত বা আপীল শুনানী, সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ, রায় প্রচারের ক্ষমতা প্রদান করে সরকার আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০ প্রণয়ন করে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালতসহ অধঃস্তন আদালতে এই আইনের অধীনে রেকর্ড সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বর্তমানেও উচ্চ আদালতে ভার্চুয়াল মাধ্যম ব্যবহার করে বিচার কার্যক্রম চলছে। এই পদ্ধতি সহজীকরণের জন্য উচ্চ আদালতে এজলাসে ল্যাপটপসহ আনুষঙ্গিক সুবিধাদি স্থাপন করা হয়েছে এবং সকল আদালতে উক্ত সুবিধাদি স্থাপন করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে অধঃস্তন আদালতে ‘ই-জুডিসিয়ারি’ বাস্তবায়নে অবকাঠামোগত সুবিধাদি স্থাপনের জন্য আইন মন্ত্রণালয় ২৭০০ কোটি টাকার প্রজেক্ট প্রস্তাব করেছে যা প্রক্রিয়াধীন। এই প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি অধিকতর সহজ হবে।

%d bloggers like this: