বন্ধ হয়নি ঋণ আদায়,পার্বতীপুরে কিস্তি দিতে না পারায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে

0

আব্দুল্লা­হ আল মামুন, পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি,

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে দিনমজুর খেটে খাওয়া হাজারো মানুষ। দেশব্যাপি অঘোষিত লক ডাউনে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে মরার ওপর খাড়ার ঘাঁ হয়ে দাঁড়িয়েছে বে-সরকারী উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি— আদায়। তাই ঋণ গ্রহিতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিক্সা ভ্যান ও অটোচালকসহ অন্যসব শ্রমজীবি মানুষ, হকার, ফেরিওয়ালারা সুদসহ ঋণের কিস্তি দিতে না পাড়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

কিস্তির টাকা জোগাতে না পেরে বাড়ি ছাড়ছেন অনেকে।
জানা যায়, পার্বতীপুর শহর ও গ্রামাঞ্চলে আশা, ব্র্যাক, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র (জিবিকে), সার্প, টিএম এস এস, গ্রাম উন্নয়ন কেন্দ্রসহ (গার্ক) স্থানীয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করে থাকে। যা ১০ হাজার থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ঋণ গ্রহিতাদের মধ্যে অনেকে আবার দুই তিনটি সংস্থা থেকেও ঋণ গ্রহণ করে ব্যবসা করে আসছেন। অনেকে কিস্তির এ টাকা দিয়ে কেনেন চার্জার ও অটোভ্যান। এরা প্রত্যেকে সুদসহ সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ করেন।

আবার রিক্সা, ভ্যান চালক এবং হাট বাজার, গ্রামাঞ্চলে শাড়ি কাপড়, বোরাকা ফেরি করেন, মলম বিক্রি করেন এমন মানুষেরা দুই থেকে তিনটি সংস্থার নিকট থেকে ঋণ নিয়ে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দেন।
শহরের ধুপিপাড়া (ফকিরটোলা) মহল্লার মোঃ আব্দুস সোবহানের স্ত্রী মোছাঃ আমেনা খাতুন (৬৩) একটি এনজিও’র থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। বাড়িতে তার স্বামী অসুস্থ। ছেলে, ছেলের বউ ও দুই নাতি নাতনি নিয়ে তার ৬ সদস্যের একটি সংসার। আমেনা নিজেই গ্রামগঞ্জে শাড়ি, বোরকা ফেরি করে বিক্রি করেন। কিন্তু করোনার কারণে দূর দূরান্তে যেতে পারেননি।

তার ছেলেও এখন বেকার বসে আছে বাড়িতে। গত শুক্রবার দুপুরে শহরের নতুন বাজারে এ প্রতিনিধির সাথে আমেনা খাতুনের কথা হয়। তিনি বলেন, এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ওপর ঋণের কিস্তি টানা (পরিশোধ করা) মোটেই সম্ভব হচ্ছে না। একই ধরনের কথা বলেন মোছাঃ নবিনা খাতুন, মোছাঃ হুচুসহ আরও অনেকে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোঃ ছানা উল্লাহ বলেন, দোকান ভাড়া, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, ছেলে মেয়েদের লেখা পাড়ার খরচসহ সব কিছু মেটাতে হয় এই দোকানের ওপর।

নিজের পুঁজি না থাকায় বিভিন্ন এনজিও’র কাছে থেকে ঋণ নিয়ে থাকি। ব্যবসা ভালো হলে ঋণ পরিশোধ করতে সমস্যা হয় না। করোনার কারণে দুই মাস ধরে বসে খেয়েছি। এখন বিকেলে ৪টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা থাকে। বেচাবিক্রি এত কমে গেছে যে, ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছি না। আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত রাখার জন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

অপর এক ব্যবসায়ী নান্নু (৪২) অনুরুপ কথা বলেন।
মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আমিনুল ইসলাম জানান, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা’য় তার সংসার চলছেনা। তাই ঋণদানকারী সংস্থা আশা থেকে নেয়া ৩০ হাজার টাকার প্রতি সপ্তাহে সাড়ে ৮শ’ টাকা পেিশাধ করতে হয়। এছাড়াও টিমএসএস থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেয়া আছে। সুদসহ কিস্তি শোধ করতে তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে তিনি উলে­খ করেন।

কিস্তি পরিশোধ পেতে সমস্যা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে, আশা, ব্র্যাক, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র, গ্রামীন ব্যাংক, সার্প এর কিস্তি আদায়কারীরা তাদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা আরও বলেন, ঋণ গ্রহিতারা প্রায় দুই মাস ঘরে বসেছিলেন এখন এদের কাছ থেকে ঋণ পরিশোধ পেতে বড় ধরনের সমস্যা বলে তারা উলে­খ করেন।
ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কিস্তির টাকা পরিশোধের জন্য ঋণদান প্রতিষ্ঠানের চাপে অবশেষে বিভিন্ন জনের কাছে ধার দেনা করে বিকাশের মাধ্যমে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাঃ শাহনাজ মিথুন মুন্নী বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য কেউ চাপ প্রয়োগ করলে তাকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা দেয়া হবে।

%d bloggers like this: