ঢাকা ২৯°সে ১৮ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আমারও মনে চায় ছেলে-মেয়ের হাত ধইরা পার্কে ঘুরতে যাই

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর সংসারে নারীর আগমন ঘটে নানান স্বপ্ন, ইচ্ছা নিয়ে। কিন্তু সব নারীর প্রত্যাশা পূরণ হয় না। বিশেষ করে যে সকল নারীর স্বামীরা সংসারের প্রতি উদাসীন তাদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। বাধ্য হয়ে পুরো সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয় নারীকেই।

তাদেরই একজন রাহেলা বেগম। বসবাস করেন রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর এলাকায়। তিন সন্তানের জননী রাহেলার বিয়ে হয়েছে ২০০৬ সালে। কিন্তু স্বামী দায়িত্বহীন। সংসার জীবনের ১০ বছর গড়াতে স্বামীর উদাসীনতায় অভাব চারদিক থেকে ঘিরে ধরে তাকে। টানাপোড়েনে সংসারে তিন সন্তানসহ পাঁচটি মুখের খাবার জোটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল তাকে। এর পর্যায়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। বারবার বলেও স্বামীকে সংসারের প্রতি দায়িত্বশীল করাতে পারেননি রাহেলা। বরং বারবার স্বামীর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাকে।

শেষমেশ সংসারের বোঝা ঘাড়ে নিতে হয়েছে রাহেলার নিজেরই। শুরুতে টুকিটাকি কাজ করে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করছিলেন তিনি। তিনি তাদের অভাব মিটছিল না। বাধ্য হয়ে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালানো শুরু করেন তিনি।

ঢাকাটাইমসের সঙ্গে আলাপকালে রাহেলা বলেন, ‘২০১৬ সালে প্রথমে পায়ের রিকশা চালানো শুরু করে। ছয় মাস পর ব্যাটারির রিকশা চালানো শুরু করি। তারপর এই কয় বছর ধইরা মিশুক চালাই।’

সকালে ঘুম থেকে উঠে সন্তানের জন্য রান্না করেন রাহেলা। সন্তানদের নাস্তা করিয়ে, সংসার কাজ শেষে সকাল ১০টায় নামেন জীবন যুদ্ধে। দিনভর ইজিবাইক চালান। এরমধ্যে কয়েকবার গিয়ে দেখা করে আসেন সন্তানদের সঙ্গে। তাই কামরাঙ্গীর চর, লালবাগ ও পুরাণ ঢাকা এলাকাতেই দেখা যায় রাহেলাকে।

রাহেলার রিকশায় করেই অনেক মা তাদের সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে যান। যা দেখে কষ্ট হয় তিন সন্তানের জননী রাহেলা বেগমের। রাহেলার ভাষায়, ‘আমারও মনে চায় মাঝে মধ্যে ছেলে মেয়ের হাত ধইরা, বাংলা শাড়ি পইড়া পার্কে ঘুরতে যাই। কত মহিলারা আমার গাড়ি কইরাই তো যায়। আমারও মনে চায় ছেলে-মেয়ে নিয়া অন্তত মাসে একবার ঘুরতে যাইতে।‘

অন্য চাকরি না করে ইজিবাইক চালিয়ে সন্তানদের তুলনামূলক বেশি খেয়াল রাখতে পারছেন বলে জানান রাহেলা। বলেন, আমি সংসারেও সময় দিতে পারি, সন্তানদেরও সময় দিতে পারি। এখানে কোনো বাধা নাই। মন চাইলে কাজে গেলাম, মন না চাইলে বাসায় থাকলাম, সন্তানদের সময় দিলাম।

রাহেলার রিকশা ও ইজিবাইক চালানোর বিষয়ে একেকজনের একেক মত। এরমধ্যে শিক্ষিত সমাজ তাকে বাহবা দিলেও কেউ কেউ তাতে কটূক্তিও করেন। তবে সেসব কথা গায়ে মাখেন না রাহেলা। বলেন, ‘বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষরা আমারে সেলুট জানায়। তারা বলে মাশআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি ভালো কাজ করছেন। আপনি আমাদের দেশের প্রতিভা। অনেক শুদ্ধ ভাষায় অনেক কিছু বলে, আমার খুব ভাল লাগে আমাকে দেখে গর্ব করে। দুই একজন মানুষ বলে- দ্যাশটারে জ্বালাইয়া খাইতাছে। আমি এগুলোরে কিছু মনে করি না। কারণ বেশির ভাগ মানুষ আমারে ভালো বলতেছে।’

গাড়ি ভাড়ায় নিয়ে চালান রাহেলা। দিনভর খাটুনীতে হাজার টাকার মতোয়ায় হয় তার। এরমধ্যে চারশো টাকা দিতে হয় ইজিবাইকের ভাড়া। বাকি পাঁচ থেকে ছয়শো টাকা দিয়ে সংসার। রাহেলা চান তার নিজের একটা গাড়ি থাকুক।

সরকারের কাছে রাহেলার দাবি তাকে একটি গাড়ি দেওয়া হোক। তিনি বলেন, সরকার যদি আমাদের দিকে একটু লক্ষ্য করত, আমাদের একটা গাড়ি দিত! নিজের গাড়ি হইলে আমরা সন্তানদের আরও যত্ন নিতে পারতাম, সময় দিতে পারতাম। একটু ভালভাবে মনে মানুষ করতে পারতাম।

জীবিকার তাগিদে পুরুষের পেশায় আসা রাহেলা দেখতে পেয়েছেন তার মতো অনেক নারীই স্বামীর অবহেলা, নির্যাতনের শিকার। সংসারের বোঝা বয়ে দিশেহারা অনেক নারী। এসব নারীদের পাশেও দাঁড়াতে চেষ্টা করেন রাহেলা। এরইমধ্যে চারজন নারীকে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালানো শিখিয়েছেন তিনি।




আপনার মতামত লিখুন :