ঢাকা ২৭.৯৯°সে ২৩শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
শিরোনাম :
দারুসসালামে ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার দুই বোন কারাগারে অভিনেত্রীকে ধর্ষণের হুমকি, যুবক গ্রেফতার গৌরীপুরে ১শ বোতল ফেনসিডিলসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক গৌরীপুরে বাস-মাহিন্দ্রা সংঘর্ষে নিহত দুই নারীসহ ৩জন ঈশ্বরগঞ্জে কর্মহীনদের মাঝে নগদ টাকা ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ গৌরীপুরে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুকুরের পাড় কেটে ফেলার অভিযোগ গৌরীপুরে কর্মহীন, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিতরণ ময়মনসিংহে কঠোর লকডাউনের ১৪ দিনে ৩০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড আদায় গৌরীপুরে অসহায় ও কর্মহীন মানুষের মাঝে মায়ের মমতা কল্যাণ সংস্থার ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরন ডোমারে হাজারো মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ

নড়াইলে হঠাৎ আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুরের রস

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল থেকেঃ

ষড়ঋতুর দেশ আমাদের বাংলাদেশ । বছরে একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে এদেশ । কালের পরিক্রমায় প্রতি বছরই হাজির হয় শীতকাল । বছরে এসময় বিভিন্ন রকমের প্রকৃতির উপাদান নিয়ে হাজির হয় এই ঋতু । কিন্তু কালের পরিক্রমায় হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার চিরচেনা অনেক রূপ । তাঁর মধ্যে অন্যতম সকালে খেজুর গাছের রস এক সময়ে শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামগঞ্জের মানুষরা ছিলানো (গাছ কাটা) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন।

কে কার আগে খেজুর গাছ কেটে প্রকৃতির সেরা উপহার সমূহের মধ্যে অন্যতম খেজুর রস সংগ্রহ করতে পারে এ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তেন। আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়ের পাঠানো তথ্য ও ছবির ভিত্তিতে জানা যায় নড়াইল জেলায় খেজুর রসে তৈরী নানা প্রকার পিঠা পায়েস ছিল গ্রামবাংলার মানুষের নবান্নের সেরা উপহার। খেজুর রস দিয়ে অল্প সময়ে তৈরী করা হতো পাটালীগুড়,ভীড়মিঠাই সহ নানা রকমের মজার মজার খাবার সামগ্রী। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস। খেজুর গাছ কাটার সাথে নিয়োজিতদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় গাছি।

কালের বিবর্তনে এখন গাছগুলোর ডালে বাবুই পাখির বাসার দেখা মেলানো ভার। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে এ গাছের সম্পর্ক পুরানো ও নিবিড়। দেশে সাধারণতঃ পুরুষ এবং স্ত্রী দু’প্রজাতির খেজুর গাছ দেখা যায়। স্ত্রী প্রজাতির গাছে খেজুর ও রস উভয়ই পাওয়া যায়। পুরুষ প্রজাতির খেঁজুর গাছ থেকে শুধুই রস সংগ্রহ করা যায়। শীত আসলে মধুর গন্ধের খেজুর রসে তৈরী নানা রকম পিঠা, পায়েস খাওয়ার বড় সাধ জাগলেও এ শুধু স্বপ্নই থেকে যায়। দেখা মিলে না খেজুর রস বিক্রেতাদের।

খেজুর গাছ বিলুপ্ত হওয়ার কারনে খেজুর রস বিক্রেতা (গাছি) এ পেশার সঙ্গে জড়িত ছিল তারা বাধ্য হয়ে অন্য পথ বেছে নিচ্ছে। গ্রাম বাংলার মাঠে আর মেঠোপথের ধারে কোথাও কোথাও দু’একটি খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে কালের সাক্ষী হয়ে থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় যৎসামান্য। কয়েক বছর আগেও দেখা যেত গ্রাম বাংলার আনাছে কানাছে সারি সারি খেজুর গাছ। গাছিরা দিনের মধ্যভাগ থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধারাল দা, মুগির আর রস সংগ্রহের হাঁড়ি পিঠের পেছনে একটি লম্বা ঝুড়িতে বেঁধে এ বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি বয়ে নিয়ে যেত খেজুর গাছ কাটার জন্য।

এ কাজে গাছিদের বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েরা সাহায্য করত পেছনে পেছনে হাঁড়ি বহন করে। আবার খুব ভোর থেকে রস সংগ্রহ করে খেজুর গুড় তৈরির জন্য একত্রিত করত। সকাল থেকে দিনের অর্ধবেলা পর্যন্ত মা-বোনেরা রস থেকে গুড় তৈরি করত। আবার অনেক গাছি কুয়াশার ভেতরেই গ্রামীণ পথ ধরে কাঁধে রসের ভার বহন করে হেঁটে চলত রস বিক্রির আশায়।দিনের বেলায় পাখিরা রসের চুঙ্গিতে বসে মনের সুখে রস খেয়ে উড়ে যেত।

মৌমাছিও রসের আশায় ভোঁ ভোঁ করে উড়ে বেড়াত। কোন কোন সময় রাতে আঁধারে দুরন্ত ছেলে মেয়েরা চিকিন পাইপ বা পাটখড়ি দিয়ে অথবা গাছে উঠে অন্য উপায়ে হাড়ির রসগুলো সাবাড় করে পানি ভর্তি করে রেখে দিতো। সে দৃশ্য দেখে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে যেত সবার। প্রতি বাড়িতে সকাল বেলা খেজুর রসের পায়েস তৈরি হতো। এখন অন্য অঞ্চল থেকে মাঝেমধ্যে খেজুর রস বিক্রি করতে এলেও চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশি। ছোট একটি রসের হাঁড়ির দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

এ সম্পর্কে শরীয়তপুর সদর উপজেলার হারুন মাদবর বলেন, এখন শীতের সময় খেজুর রস নেই এ কথাটি বিশ্বাস করতে পারছি না। এক শ্রেণীর গাছির অসাবধানতার দরুন গাছের মাথা মরে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গাছি না থাকায় খেজুর গাছের রস বের করার সঠিক পদ্ধতি না জানার কারণে অনেক খেজুর গাছ অকালে মরে যাচ্ছে। এছাড়া জ্বালানি হিসেবে বা ঘরের খুঁটি হিসেবে ব্যবহারের কারণে প্রায় খেজুর গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। খেজুর গাছের পোড়ানো ইটের রং গাঢ় হয়।

এছাড়াও গাছ অপোকৃত সস্তা দামে পাওয়া যায় বলে ইট ভাটায় এর চাহিদা বেশী। এসব কারণে দিন দিন খেজুর গাছ বিলুপ্ত হওয়ায় খেজুরের রস ও খেজুর গাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুর গাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুর গাছ নিধন হচ্ছে, সে তুলনায় রোপণ করা হয় না। রসনা তৃপ্তির উপকরণ সুমিষ্ট রসের জন্যই নয়, জীবনের প্রয়োজনে প্রকৃতির ভারসাম্য ও বাংলার ঐতিহ্য ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ রোপণ করা দরকার এমন আকুতি অনেকের। একদিন পুরোপুরি খেজুর গাছ হারিয়ে যাবে শুধু বইয়ের পাতায় খেজুর গাছের কথা লেখা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবেনা।

আসুন গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য খেজুর গাছ কাটা বন্ধ করে সকলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে খেজুর রসের তৈরী নানা স্বাদের খাবার নিয়ে মেতে উঠি।




আপনার মতামত লিখুন :

এক ক্লিকে বিভাগের খবর