প্রত্যক্ষদর্শী আয়েশার মুখে সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

0

 

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সমাবেশের প্রধান অতিথি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আহত হন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস সহিংসতা এটি। এ হামলায় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ ২৪ জন প্রাণ হারান। আহত হন আরও ৩০০ জনের বেশি। ১৬ বছর আগের এ হামলায় যারা প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ঘটনার দৃশ্যপট।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২২, ২৩ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর আয়েশা মোকাররম এ হামলায় আহতদের একজন। সেসময় তিনি মহানগর দক্ষিণ মহিলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। হামলায় নিজে আহত হওয়ার পাশাপাশি হারিছেন নিজের মামীকে। সমাবেশে তার সঙ্গে যাওয়া অপর এক কর্মীও নিহত হন।

ঢাকা টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউকে কারবালার প্রান্তর আখ্যা দিয়েছেন মহিলা আওয়ামী লীগের এ সাবেক নেত্রী। ঘটনার বর্ননা দিয়ে আয়েশা বলেন, ‘আমাকে আইভী আপা বলল, আয়েশা তুমি কিছু মহিলা নিয়ে আসো। আজ আমাদের মৌন মিছিল হবে। এখানে আমাদের প্রধান অতিথি থাকবেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।’

‘আমি ২০ জন নিয়ে গেলাম। একদম ট্রাকের সামনে আমরা ছিলাম সব মহিলাগুলো। আইডি আপা আমাদেরকে বলল, আমাদেরকে মিছিল করতে হবে। আমরা ব্যানার নিয়ে সামনে যাব। এরমধ্যে মতিয়া আপা এসে বলল, এখন না। একটু পরে। আমরা সেখানে দাঁড়ালাম। ঠিক বাটার সামনে। মতিয়া আপা আইভি আপাকে বলল, আইবি তোমার যদি কোন সমস্যা থাকে তুমি এসো না। মেয়েদের কি আমার সঙ্গে দিয়ে দাও।’

‘এরমধ্যে আইভী আপা আমাকে বলল, আমাকে একটু ট্রাকের সামনে দিয়ে আসো। আমি তোমাদের ভাইয়ের কাছে যাব, ট্রাকে উঠবো। আমি তাকে ট্রাকের কাছে দিয়ে আসলাম। আমরা পার্টি অফিসের দরজার সামনে গিয়ে আইসক্রিম কিনলাম। আমরা আইসক্রিম খাচ্ছিলাম। আইসক্রিম একটা কামড় দিলাম। এর মধ্যে একটা বিকট আওয়াজ! প্রথম আওয়াজটা কিছু বুঝি নাই। কি হইল! দ্বিতীয় বারে বুঝলাম যে আমার হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেছে। সবাই দৌড় দিল। আমিতো দৌড় দিলাম।’

আয়েশা বলেন, ‘একটা দোকানের ভেতর দিয়ে গলির ভেতর দিয়ে দোতালায় ওঠা যায়। সেখান দিয়ে দৌড়ে দোতলায় উঠে গেলাম। গিয়ে দেখলাম নাসিম ভাই আহত। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপা কি আছেন? আপা কি আছেন? আমি উঁকি দিয়ে দেখলাম, আপা আতঙ্কিত। আপাকে গাড়ির ভিতরে ঢুকায় দিয়ে গাড়িটা নিয়ে চলে গেল। আপা যাওয়ার পরপরই সবাই দৌড় দিল। আমিও দৌড় দিলাম। আমি এতগুলো মহিলা নিয়ে আসছি, সেই টেনশন।’

এ হামলায় প্রাণ দেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মীনী আইভী রহমান। হামলার সময় আহত অবস্থায় তার সঙ্গে কথা হয়েছিল আয়েশা মোকাররমের। স্মৃতিচারণ করে আয়েশা বলেন, ‘আমি গিয়ে দেখি আইভি আপা বসে আছেন। তিনি আমাকে ডাক দিল আয়শা, আয়শা, এদিকে আসো। দেখো আমার পা নাই, আমার পা নাই। আপা নিজে শাড়ি তুলে দিয়ে দেখানো যে তার পা নাই। আমি দেখলাম আপার একটা পা এক মহিলা কুঁচকে মরে পড়ে আছে তার পেটের উপর পরে আছে।’

যে ২০ জন নারীকে নিয়ে আয়েশা সমাবেশে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে দুই জন মারা যায়। আয়েশা বলেন, ‘আমি মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, এরমধ্যে দেখলাম আমার মামী, সে মারা গেছেন। আমি যে বিশ জন মহিলা নিয়ে গিয়েছিলাম তার মধ্যে আমার মামীর একজন ছিল। মামীর এই অবস্থা দেখে সবাই চিৎকার দিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখি আমার আরও একটা মহিলা মারা গেছেন। তার নাম ছিল রাজিয়া। রাজিয়ার তখনও জীবনটা আছে। তারপর আমরা ধরাধরি করে নিয়ে গেলাম ঢাকা মেডিকেলে। মেডিকেলে গেলাম। সেখানে কোনো চিকিৎসা নেই, কোন ডাক্তার নাই! কি যে সেই আহাজারি! সেই দৃশ্য বলতে পারবোনা। কারবালার প্রান্তর আমরা পড়েছি। কিন্তু সেদিন আমরা ঐ বীভৎস চিত্র চোখে দেখেছি। রক্তগুলো সব কালো হয়ে গিয়েছিল। সেই রক্তের উপর দিয়ে হাঁটতে হয়েছে।’

চিকিৎসা মেলেনি হাসপাতালেও। মরদেহ গুম করার শঙ্কা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে সবাইকে নেয়ার পর দলের সকল নেতাকর্মীরা হাসপাতালে আসল। তখন আমাকে সবাই বলল, আমার মামীর লাশ নিয়ে যেতে। বলল, এখানে আর রাইখেন না। ওরা লাশ গুম করবে। তখন আমি বাসায় জানালাম, আমার ভাইরা, ভাবিরা সবাই আসল, আমার মামীর লাশ নিয়ে গেলাম। আহত হয়েছিলেন নিজেও। দলের নেতাকর্মীদের মর্মান্তিক অবস্থায় নিজেই বুঝে উঠতে পারেননি যে তিনিও আহত হয়েছেন। দিন কেটে গেছে স্পিনটার গায়ে নিয়ে। বাসায় ফেরার পর তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে শুরু করেন তিনি। যেতে হয় পুনরায় হাসপাতালে।

আয়েশা বলেন, ‘আমি বাসায় যাওয়ার পর, আমি ব্যাথায় ছটফট করছিলাম। আমার পায়ে বেশ কিছু স্পিনটার ছিল। আমাকে নিয়ে আবার সবাই হাসপাতালে নিয়ে গেল। এক্সরে করে, ওষুধ দিয়ে আবার বাসায় পাঠালো।’

%d bloggers like this: