প্রণোদনা বাস্তবায়নে ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করার তাগিদ

0

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক,

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ পেতে ঋণ প্রদানে বিদ্যমান প্রক্রিয়াও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করছে। যার ফলে এসএমই উদ্যোক্তারা এখনও প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা পাননি। তাই, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত ঋণ ছাড় প্রক্রিয়া সহজ করার তাগিদ দিয়েছেন উদ্যোক্তা সংশ্লিষ্ট আলোচকরা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ‘কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তরণ’ শীর্ষক ওয়েবিনারের আয়োজন করে। এতে অংশগ্রহণকারী আলোচকবৃন্দ দ্রুত ঋণ ছাড়ের তাগিদ দেন।

এছাড়াও প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের নিকট ঋণ সহায়তার আওতায় নিয়ে আসার জন্য বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং পিকেএসএফ প্রভৃতির মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ সহায়তা প্রদানের কার্যক্রমে অন্তভূক্তিকরণেরও দাবি জানান আলোচকরা।

ঢাকা চেম্বার আয়োজিত এ ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফারাহ মো. নাসের, যেখানে বিভিন্ন ব্যাংকের এসএমই শাখার প্রধানরা বিদ্যমান ঋণ পরিস্থিতির ওপর মতবিনিময় করেন।

ওয়েবিনারের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে কটেজ, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তিনি বলেন, এখাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩ মিলিয়ন, যারা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৩৫.৪৯ শতাংশের যোগান দিচ্ছে। ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দেশের অন্যান্য খাতের মতো ‘কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাবৃন্দ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ অবস্থা উত্তরণে সরকারের পক্ষ হতে ইতিমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে উদ্যোক্তারা ব্যাংক হতে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।

তিনি জানান, ঢাকা চেম্বার ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে এবং উদ্যোক্তাবৃন্দ বেশিরভাগই, প্রণোদনা প্যাকেজ হতে প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা না পাওয়ার বিষয়টিকে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি কোভিড পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ঋণ সহায়তা পাওয়া দ্রুততর করার জন্য ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়া আরো সহজীকরণের আহ্বান জানান।

ডিসিসিআই’র ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এন কে এ মবিন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের সহায়তার লক্ষ্যে ঢাকা চেম্বার সম্প্রতি ‘এসএমই ডেভেলপমেন্ট বিভাগ’ চালু করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এ খাতের উদ্যোক্তাদের বিক্রি প্রায় ৩৫% কমে গেছে এবং উদ্যোক্তাদের প্রায় ৬২.৪% কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ ট্যাক্স, ভ্যাট প্রদানে সক্ষমতা হারিয়েছে।

ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি বলেন, ব্যাংক হতে ঋণ সহায়তা পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতকরণে উদ্যোক্তারা নানাধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং ডিসিসিআই পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, ৫৯% ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তা মনে করেন, ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ঋণ সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া বেশ জটিলতর। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি ঋণ প্রদানের পদ্ধতি সহজতর করা এবং প্রণোদনার প্যাকেজ হতে ঋণ প্রদানের গতি আরো বেগবান করার আহ্বান জানান।

প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফারাহ মো. নাসের বলেন, কোভিড পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং ব্যবসায়িক কর্মকা- অব্যাহত রাখার জন্যই মূলত প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।

তিনি জানান, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকসমূহ থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্যাকেজের আওতায় উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা প্রদানে ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

নির্বাহী পরিচালক বলেন, উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে দেশের বাণিজ্য সংগঠনসমূহ বেশ এগিয়ে এসেছে এবং এ ব্যাপারে ব্যাংকসমূহকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি এ পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে সাপ্লাইচেইন ব্যবস্থাপনার উপর আরো বেশি মনোযোগী হওয়ার উপর জোরারোপ করেন।

তিনি প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ সহায়তাটি ‘ওয়ার্কিং লোন’-এর ন্যায় ‘টার্ম লোন’ হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে আশ্বাস দেন।

নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ ক্ষুদ ও কুটির শিল্প কপোরেশন (বিসিক)-এর মহাব্যবস্থাপক আখিল রঞ্জন তরফদার, এসএমই ফাউন্ডেশন-এর মহাব্যবস্থাপক মো. নাজিম হাসান সাত্তার এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব ফেরদৌসি বেগম অংশগ্রহণ করেন।

বিসিক-এর মহাব্যবস্থাপক আখিল রঞ্জন তরফদার বলেন, এসএমই উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাত্র ২৮% ব্যাংক হতে ঋণ সহায়তা পেয়ে থাকে। তিনি দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ সুবিধা প্রদানের জন্য বিসিক-এর মত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব করেন।

এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মো. নাজিম হাসান সাত্তার বলেন, সরকার ঘোষিত প্রণোদনার প্যাকেজ হতে উদ্যোক্তারা কিভাবে ঋণ সহায়তা পাবে, সে ব্যাপারে গাইডলাইন প্রস্তুত করছে এসএমই ফাউন্ডেশন। প্রণোদনার প্যাকেজ হতে ঋণ সহায়তা প্রাপ্তির লক্ষ্যে তিনি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংঘবদ্ধভাবে আবেদনের প্রস্তাব করেন।

তিনি উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য শুধুমাত্র ব্যাংকের উপর নির্ভর করার প্রবণতা পরিহার করে, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন, পিকেএসএফ-এর মত প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় মুদ্রানীতিতেও পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব ফেরদৌসি বেগম বলেন, প্রণোদনার প্যাকেজ হতে ঋণ সহায়তা পাওয়ার জন্য বেশিরভাগ কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং মাঝারী শিল্প উদ্যোক্তাবৃন্দের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, তবে উদ্যোক্তাবৃন্দ যেন দ্রুততম সময়ে ঋণ সহায়তা পেতে পারেন সে বিষয়টিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

মুক্ত আলোচনায় ব্র্যাংক ব্যাংকের এসএমই বিভাগের প্রধান সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের সংজ্ঞায়নে ট্রেডিং-এর আওতায় হওয়ায়, তাদের ঋণ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না, যা দ্রুত সংশোধন করা প্রয়োজন। তিনি এসএমই খাতে ঋণের সুদের হার বিদ্যমান ৯% থেকে কমানোরও প্রস্তাব করেন।

%d bloggers like this: