পারল না পিএসজি, ইউরোপসেরা বায়ার্নই

0

 

শেষ বাঁশি বাজার পর কোমড়ে দুই হাত চেপে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলেন এমবাপে। দলের বড় তারকা নেইমার কষ্টে মাথা লুকালেন বিপক্ষ দলের খেলোয়াড় অ্যালবার বুকে। আলতো স্পর্শে নেইমারকে সান্ত্বনা দিলেন অ্যালবা। সঙ্গঙ্গে বায়ার্ন কোচ ফ্লিকও। তাতে কি আর মন মানে ব্রাজিল সুপারস্টারের? সবুজ আঙিনা ছেড়ে গ্যালারিতে বসে নেইমারের চোখ ছলছল করে উঠল।

ক্যামেরা ধরতেই দুই হাতে মুখ লুকালেন। তবে অদূরে বসা লিয়েন্দ্রো পারেদেস ভাবলেশহীন। তিনি মুখ লুকালেন না। কাঁদলেন অঝোর ধারায়। লিসবনে গোটা পিএসজি শিবির তখন শোক স্তব্ধ, হতাশায় ন্যুব্জ। হৃদয় তোলপাড়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠেও হলো না স্বপ্নপূরুণ। আরাধ্যের ট্রফি থাকল অস্পর্শ। উল্টো প্যারিস সেইন্ট জার্মেইর (পিএসজি) হৃদয় এফোড় ওফোড় করে দিয়ে সাত বছর পর ইউরোপ সেরার তকমা গায়ে লাগালো বায়ার্ন মিউনিখ। রোববার রাতে লিসবনে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পিএসজিকে ১-০ গোলে হারিয়ে ষষ্ঠবারের মতো শিরোপা জেতে অদম্য জার্মান জায়ান্টরা।

ধারে-ভারে অনুমিতভাবে পিএসজির চেয়ে এগিয়ে ছিল বায়ার্নই। কোয়ার্টার ফাইনালে বার্সেলোনাকে ৮-২ গোলে উড়িয়ে দেয়া বায়ার্নকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন দেখছিল অনেকে। সেমিতে অলিম্পিকলিওর বিপক্ষে সহজ জয় ওই রাস্তাকে আরো সুগম করে দেয় বাভারিয়ানদের। তবে ফাইনালে তেজোদীপ্ত সেই বায়ার্নকে আসলে দেখা যায়নি। ম্যাচের ফল নির্ধারণ হয় একটিমাত্র গোলে। যে গোলটি আসে কিংস লেকোম্যানের দুরন্ত হেডে।

একসময় পিএসজিতে খেলা কোম্যানের গোলেই ট্রেবল জয়ের আনন্দে ভাসে গোটা বায়ার্ন শিবির। উন্মত্ত উল্লম্ফনে মাতে মুলার-লেভানদোভস্কিরা। ফ্রেঞ্চম্যান কোম্যানের একটি গোল যেন পাজর ভেঙে দেয় গোটা ফরাসি শিবিরকে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের শুরুটা ছিল ম্যাড়মেড়ে। অগোছালো আক্রমণ, ভুল পাসের ছড়াছড়ি। ১৮ মিনিটে প্রথম ভালো একটি আক্রমণ শানায় পিএসজি। গোলের সুযোগটা পেয়েছিলেন পোস্টারবয় নেইমার। বুলেট গতির শট দু’পা ছড়িয়ে কর্ণারের বিনিময়ে রক্ষা করেন বায়ার্নের অতন্দ্রপ্রহরী ম্যানুয়েল নয়্যার। ২১ মিনিটে এগিয়ে যেত পারত বায়ার্ন। ভাগ্য সহায় হয়নি।

টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত স্ট্রাইকার লেভানদোস্কির শট ফিরে আসে পোস্টে লেগে। ২৩ মিনিটে ডিমারিয়ার শট বারের ওপর দিয়ে চলে গেলে হা-হুতাশে পোড়ে পিএসজি। এরপরই একটা ধাক্কা খায় বায়ার্ন। চোট পেয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়েন ডিফেন্ডার জেরোমে বোয়াটেং, বদলি নামেন নিকলাস সুলে।

৩১ মিনিটে বায়ার্নের আক্রমণ। ডান প্রান্ত থেকে উড়ে আসা ক্রসে হেড করেন লেভানদোডস্কি।অপ্রস্তুত ছিলেন পিএসজি গোলরক্ষক নাভাস। ভাগ্যিস বলটা সোজা গিয়েছিল। কোনোমতে পাঞ্চ করে বল ক্লিয়ার করেন।বিরতির আগে গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন এমবাপে। ডিমারিয়ার ফিরতি পাসে বল ধরে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারেননি তিনি। দৃষ্টিকটু দুর্বল শট নেন এমবাপে। যা সহজেই গ্লাভস বন্দী করেন নয়্যার।
প্রথামার্ধে বল পজিশনে বায়ার্ন অনেক এগিয়েছিল, ৬২ শতাংশ। সেখানে ৩৮ শতাংশ ছিল পিএসজির। পোস্টে পিএসজির শট ছিল দুটি, বায়ার্নের একটি।প্রথমার্ধ গোলশূন্য।

আর তাতে নতুন এক রেকর্ড দেখে ফেলে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল। সর্বোচ্চ ৪৩ মিনিট অবধি গোলশূন্য। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে সর্বশেষ এমনটি দেখা গিয়েছিল ১৭ বছর আগে। ওল্ড ট্রাফোর্ডে যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল জুভেন্টাস ও এসি মিলান। এবারকার ফাইনাল গোলখরা কাটায় ৫৯ মিনিটে।

দ্বিতীয়ার্ধের ৫২ মিনিটে ম্যাচে বাড়তি উত্তেজনা। নেইমারকে ফাউল করেন জিনাব্রি। তেড়ে আসেন পিএসজির লিয়েন্দ্রো পারেদেস। মারেন ধাক্কা। সাময়িক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়।

রেফারি দুজনকেই হলুদ কার্ড দেখান। ৫৯ মিনিটে কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায় বায়ার্ন। ডান প্রান্ত থেকে জশকিমিচের মাপা ক্রসে কিংসলে কোম্যানের বুদ্ধিদীপ্ত হেড। বল জড়ায় পিএসজির জালে। ১-০তে লিড নেয় ফ্লিকের শিষ্যরা। নিজের সাবেক ক্লাবের বিরুদ্ধে গোলের পর উল্লাস ধরে রাখতে পারেননি কোম্যান। চ্যাম্পিয়্নস লিগের ইতিহাসে বায়ার্নের এটি ৫০০তম গোল। তবে এই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোল ১৩ বারের চ্যাম্পিয়ন রিয়ালের, ৫৬৭। ৫১৭ গোল নিয়ে দ্বিতীয়স্থান বার্সেলোনা। তৃতীয় বায়ার্ন।

এর কিছুক্ষণ পর ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুযোগ তৈরি করে ছিলেন কোম্যান।তবে তার ভলি রুখে দেন ডিফেন্ডার সিলভা।৭০ মিনিটে কাছ থেকে মার্কিনিয়োসের দুর্বল শট পা দিয়ে ঠেকান বায়ার্ন গোলরক্ষক।
আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে শেষদিকে জমে ওঠে ম্যাচ।কোয়ার্টার-ফাইনালে আটলান্টার বিপক্ষে যোগ করা সময়ে জয় সূচক গোল করা এরিক মাক্সিমচুপো-মোটিং এবারও শেষ সময়ে পান দুটি ভালো সুযোগ।তবে বিপজ্জনক জায়গা থেকে একবারও বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি তিনি। ৮২ মিনিটে লেভানদোভস্কির শট চলে যায় পোস্টের বাইরে দিয়ে। ৮৪ মিনিটে সেট পিস থেকে পাওয়া কুতিনহোর ফ্রি কিক চলে যায় পোস্টে বাতাস লাগিয়ে।

৯০ মিনিটের খেলা শেষ ১-০ ব্যবধানে। অতিরিক্ত ৫ মিনিট। দুই মিনিটের মাথায় ভাগ্য সহায় থাকলে সমতায় ফিরতে পারত পিএসজি। পাল্টা আক্রমণে বক্সের মধ্যে নেইমারের ক্রসে পা লাগাতে পারেনি কেউ। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। নেইমারদের চোখের সামনে ট্রফি নিয়ে জয়োল্লাস করেছে জার্মান শিবির।
টানা ৩৪ ম্যাচ পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোলের দেখা পেল না পিএসজি।আর তাতেই ইউরোপ সেরার মঞ্চে ফসকে গেল আরাধ্যের ট্রফিও।

%d bloggers like this: