পানি পানের সঠিক নিয়ম

0

স্বাস্থ্য ডেস্ক:

জীবনের জন্য অক্সিজেন-এর পরেই পানির স্থান। পৃথিবীর মতো প্রত্যেকটি মানুষেরও শরীরের ৭২% হলো পানি। এমনকি হাড়ের এক-চতুর্থাংশ, পেশির তিন-চতুর্থাংশ ও মস্তিষ্কের ৮৫% পানি দিয়ে গঠিত। আমাদের রক্ত ও ফুসফুসের ৮০% পানির তৈরি। সুস্থ ও সবলভাবে বেঁচে থাকার জন্য পানি পানের কোনো বিকল্প নেই। পানি কিডনির মাধ্যমে আপনার শরীরের সব ক্ষতিকারক উপাদান দূর করে দেয়। তবে পানি পান করার বিশেষ কিছু নিয়ম আছে।

স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া করেন এমন সুস্থ-সবল মানুষ, তার ওজন ও কাজের ধরনের উপর নির্ভর করে, দিনে ৩-৪ লিটার এমনকি ৫-৬ লিটার পর্যন্ত পানি পান করতে পারেন। তবে ঠান্ডা ঘরে এসির মধ্যে শুয়ে-বসে থাকা মানুষ যদি লিটার লিটার পানি খেতে শুরু করেন, সমস্যা আছে। কম লবণ খেলে তো বিশেষ করে। দিনে ৩-৪ গ্রামের মতো লবণ ও ৫-৬ লিটার পানি খাওয়া মোটে ভাল নয়। বেশি বয়সে ও কিডনি কম কাজ করলে বিপদ আরও বেশি।

কিডনি বিশেষজ্ঞের মতে, দিনে যত গ্রাম লবণ খাবেন, পানি খেতে হবে মোটামুটি তত লিটার। সুস্থ-সবল কমবয়সী মানুষ ৫-৭ গ্রামের মতো লবণ খেলে ৫-৭ লিটার পর্যন্ত পানি পান করতে পারেন। কোনও কারণে কম লবণ খেতে হলে সেই হিসেবে পানি খাওয়া না কমালে রক্তে সোডিয়াম কমে বিপদ হতে পারে। বাড়াবাড়ি হলে সোডিয়াম বিপদসীমার নিচে নেমে গিয়ে হাইপোন্যাট্রিমিয়ার মতো সমস্যা হওয়াও বিচিত্র নয়।

হাইপোন্যাট্রিমিয়া হলে যেসব সমস্যা হয়: প্রথমে গা-বমি করে বা বমি হয়, ক্লান্ত লাগে, বারবার মূত্রত্যাগ করতে হয়, মাথা ব্যথা করে। আচমকা আচ্ছন্ন বা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে পারেন। বয়স্ক মানুষদের সমস্যা বেশি হয়। সঙ্গে ভুলে যাওয়ার অসুখ থাকলে বিপদ বাড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে সামান্য কিছু ক্ষেত্রে রোগী মারা যান। খুব কম সময়ে প্রচুর পানি খেয়ে নিলে সামান্য কিছু ক্ষেত্রে চরম বিপদ হতে পারে।

কিছু মানুষ ছোট থেকে জেনে এসেছেন, বেশি পানি পান করলে শরীরে জমা বিষ বেরিয়ে যায়। স্বাস্থ্য ভাল থাকলে কম বয়সে তাতে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু কোনও কারণে পানি কম পানের প্রশ্ন এলে, তারা তা করে উঠতে পারেন না। বিপদ বাড়ে। অনেক বেশি পানি খেলে তা রক্তকে পাতলা করে পরিমাণে বাড়িয়ে এক দিকে যেমন ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্সের সূত্রপাত করে, সঙ্গে চাপ বাড়ে শিরা-ধমনি ও হৃদযন্ত্রে। খাটনি বাড়ে কিডনির। ১-২ ঘণ্টার মধ্যে ৭-৮ লিটার পানি পান করলে সমস্যার জের মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় কখনও। হালকা মাথা ব্যথা থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্ট বা মৃত্যুও হতে পারে। কাজেই পানি পান করুন মেপে।

আগেও আমাদের দেশে ৬৫-৭০ কেজি ওজনের কর্মক্ষম সুস্থ মানুষের শরীরে পানির চাহিদা ছিল ৩-৪ লিটার। শীতকালে তা কমে ২-৩ লিটার। এখন গরমে তা দাঁড়িয়েছে ৪-৫ লিটার ও শীতে ৩-৪ লিটার। আগামী ২০ বছরে তা আরও এক লিটারের মতো বাড়বে বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান। এর একটা কারণ যদি হয় পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই মেদবাহুল্য। পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার কারণে মানুষের গড় উচ্চতা বাড়ছে, সেও আরেক কারণ। কাজেই ৫০ কেজি ওজনের একজন মানুষ যদি ঠান্ডা ঘরে শুয়ে-বসে থাকেন, তাকে যতটা পানি পান করতে হবে ৭৫ কেজি ওজনের, রোদে-পানিতে ঘোরা মানুষকে তার চেয়ে বেশি খেতে হবে। প্রচণ্ড তাপের মধ্যে কাজ করলে বা দূরপাল্লার দৌড়বাজদের খেতে হবে আরও বেশি।

কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন তার উপরও নির্ভর করে পানির চাহিদা। ঘরে কম তেল-লবণ-মশলায় রান্না করা সুষম খাবার খেলে কম পানি পান করলেই হয়। আর ফাস্ট ফুড বা প্রসেসড ফুডে প্রচুর লবণ থাকে বলে এ সব নিয়মিত খেলে পানি পান বাড়াতে হয়।

কেউ বলছেন তেষ্টা পেলে পান করেন। কেউ মনে করেন পানি পান করতে হবে ঘণ্টায় ঘণ্টায়। কারও মতে প্রস্রাবের রং দেখে বুঝতে হবে পানি ঠিক মতো পান করা হচ্ছে কি না। ওজন বেশি হলে আবার দিনের প্রতিটি খাবার খাওয়ার ঠিক আগে পানি পান করতে বলেন কিছু ফিটনেসগুরু, যাতে কম খাবারে পেট ভরে।

চিকিৎসকের মতে, শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে পানি পান করা উচিত তেষ্টা পেলে। ডায়াবেটিস থাকলে অনেক সময় শরীরে পানির চাহিদা না থাকলেও তেষ্টা পায়। কিডনি ঠিক থাকলে তাতে ক্ষতি নেই। কারণ যত বার প্রস্রাব হয় তার সঙ্গে কিছুটা করে সুগার বেরিয়ে গিয়ে উন্নতিই হয় রোগের।

তবে হার্ট ফেলিওর, ক্রনিক কিডনির অসুখ, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ ইত্যাদির কারণে যাদের লবণ কম খেতে হয়, তাদের পানির ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার। ঠান্ডা ঘরে সময় কাটালে হুটহাট পানি খাওয়ার বদলে এক-আধবার চা খেয়ে তেষ্টা মেটালে কোনও ক্ষতি নেই। আবার অত পানি খেতে ভাল লাগে না বলে মাঝেমধ্যে যে স্যুপ, ঘোল, ফলের রস, চা-কফি খাওয়া হয়, তার হিসেবও পানির মধ্যে ধরতে হবে। কারণ দিনে ৩-৪ লিটার তরলের চাহিদা যে স্রেফ পানি দিয়েই মেটাতে হবে, এমন কিন্তু নয়।

ভারী খাবার গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যদি পানি পান করেন, তাহলে বিভিন্ন এনজাইমগুলো সঠিক মাত্রায় খাবারের সঙ্গে মিশতে পারবে না। ফলে হজম প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়, যা কিনা সকল রোগের উৎস! খাওয়ার ৪০ মিনিট পরে একটি লেবুর রস হালকা কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে পান করুন। স্ট্রোক বা হার্ট এটাক এড়াতে ঘুমের কিছুক্ষণ আগে সামান্য পানি পান করবেন।

%d bloggers like this: