ধর্ষণ-অপহরণের পর চার হত্যায় ১৪ জনের মৃত্যুদণ্ড

0

নিজস্ব প্রতিবেদক:
খাগড়াছড়িতে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যায় তিনজন ও চট্টগ্রামে নয় বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যায় আটজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। এছাড়া টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দুই শিশুকে অপহরণের পর হত্যার মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। অর্থাৎ ধর্ষণ আর অপহরণের পর হত্যায় তিন জেলায় মোট ১৪ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।
প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর: খাগড়াছড়িতে ধনিতা ত্রিপুরা নামের এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে তিন যুবককে মৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেছে আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- রুমেন্দ্র ত্রিপুরা ওরফে রুমেন, ত্রিরন ত্রিপুরা ও কম্বল ত্রিপুরা। তাদের মধ্যে কম্বল ত্রিপুরা পলাতক রয়েছেন। সোমবার দুপুরে খাগড়াছড়ি নারী ও শিশু দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. আবু তাহেরের আদালত এ রায় দেন।
খাগড়াছড়ির পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট বিধান কানুনগো জানান, ২০১৯ সালের ১৩ মে খাগড়াছড়ি সদরের ভাইবোনছড়ার বড় পাড়ার বাসিন্দা মন মোহন ত্রিপুরা ও স্বরলেখা ত্রিপুরা তাদের কিশোরী মেয়ে ধনিতা ত্রিপুরাকে (১৭) বাসায় একা রেখে দীঘিনালায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। এই সুযোগে একই ইউনিয়নের বেজাচন্দ্র পাড়ার তিন যুবক মদ্যপ অবস্থায় ঘরে ঢুকে ওই কিশোরিকে দলবেঁধে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরদিন সকালে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পুলিশ তিন যুবককে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় কিশোরীর মা স্বরলেখা ত্রিপুরা তিনজনকে আসামি করে মামলা করে। পুলিশ একই বছর ২৮ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। মামলায় ২২ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত দণ্ডবিধি ৩০২/৩৪ ধারায় প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছে।
চট্টগ্রামে নয় বছরের শিশু ফাতেমা আক্তার মীমকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আট আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। সোমবার চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক এ আদেশ দেন। রায় ঘোষণা সময় আদালতে উপস্থিত ছিল সাত আসামি। অপরজন পলাতক।
২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি আকবর শাহ থানার বিশ্ব কলোনির মমতাজ ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির পাশ থেকে মিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় শিশুটির মা রাবেয়া বেগম নগরীর আকবর শাহ থানায় ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আট থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়।
ওই বছরের ২৫ জানুয়ারি মামলার পাঁচ আসামি মো. বেলাল হোসেন ওরফে বিজয় (১৮), মো. রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল (১৬), মো. হাছিবুল ইসলাম ওরফে লিটন (২৬), মো. আকসান মিয়া ওরফে হাসান (১৮) ও মো. সুজন (২০) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হোসাইনের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
ওই সময় পুলিশ জানায়, মায়ের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে শিশু ফাতেমা আক্তার মীমকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। শিশুটির মায়ের সঙ্গে আসামি বেলাল হোসেন বিজয়ের মায়ের বিরোধ ছিল। তার জেরেই বিজয় অন্যান্য আসামিদের যোগসাজশে তাকে তুলে গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে।
মীমের মায়ের সঙ্গে আসামি বিজয়ের মায়ের বিরোধ প্রসঙ্গে পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) মো. ফারুক উল হক ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি জানয়েছিলেন, মীমের মা রাবেয়া বেগম জিম্মাদার হয়ে বিজয়ের মাকে এনজিও সংস্থা ব্র্যাক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দেন। টাকা নেয়ার পর বিজয়ের মা তা পরিশোধ না করায় রাবেয়া ঝামেলায় পড়েন। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে ঝগড়া হয়।
অন্যদিকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দুই শিশুকে অপহরণের পর হত্যার মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছে আদালত। এদের মধ্যে তিনজনের আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড ও অপর তিনজনের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। আদালত একইসঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেছে।
সোমবার বেলা পৌনে ১২টায় টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক সাউদ হাসান এ রায় ঘোষণা করেন। বিষয়টি আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌশুলি (এপিপি) খোরশেদ আলম নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, ঢাকার ধামরাই উপজেলার চরহাট গ্রামের শামছুল হকের ছেলে বাহাদুর মিয়া, একই গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে মিল্টন ও মির্জাপুর উপজেলার সুজালিলজা গ্রামের বাছেদ মিয়ার ছেলে মো. রনি মিয়া।
আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছেন, মির্জাপুর উপজেলার আমরাইল তেলিপাড়া গ্রামের শাহাদত হোসেনের ছেলে আবদুল মালেক, শশ্বধরপট্টি গ্রামের মমরেজের ছেলে জহিরুল ইসলাম, চর চৌহাট গ্রামের আফসার উদ্দিনের ছেলে শাহনুর শাহা ও যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছে চরচৌহাট্ট গ্রামের আফসার উদ্দিনের ছেলে মো. শামীম মিয়া, একই গ্রামের তাজেল মিয়ার ছেলে আরিফ ও মির্জাপুরের আমরাইল তেলিপাড়া গ্রামের জব্বার মল্লিকের ছেলে মো. জাকির হোসেন। এদের মধ্যে ধামরাই উপজেলার চর চৌহাট গ্রামের তাজেল মিয়ার ছেলে আরিফ (২৮) পলাতক। মিল্টন ইমরানে ফুপাতো ভাই ও রনি ইমরানে চাচাতো ভাই।
অতিরিক্ত সরকারি কৌশুলি (এপিপি) খোরশেদ আলম জানান, ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি বুধবার বিকালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার হারিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা দেখতে যায় ঢাকার ধামরাই উপজেলার চর চৌহাট এলাকার প্রবাসী দেলোয়ার হোসেনের ছেলে শাকিল (১০) ও একই গ্রামের প্রবাসী আবু বক্করের ছেলে ইমরান (১১)। পরে অপহরণের শিকার হন চতুর্থ শ্রেণির এ দুই শিক্ষার্থী।

পরদিন ২৮ জানুয়ারি মোবাইল ফোনে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। ২৯ জানুয়ারি রাতে মির্জাপুর উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের একটি লেবু বাগান থেকে নিখোঁজ ওই দুই শিশুর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়।
৩০ জানুয়ারি এক শিশুর মা মামলা করেন। এরপর আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। বাকি এক আসামি এখনো পলাতক। এ মামলায় পুলিশ ১১ জনের নামে চার্জশিট দেয়। এদের মধ্যে শহিদুল ইসলাম ও মনোয়াররে বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় আদালত।

%d bloggers like this: