ঢাকা ২৭.৯°সে ১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান

আরবী চান্দ্র সনের নবম মাসের নাম রমজান। বছর ঘুরে আমাদের মাঝে ফিরে এলো পবিত্র রমজান মাস। সিয়াম সাধনার মাস। রহমত বরকত, আত্মশুদ্ধি, সংযম হওয়ার মাস। ধনী-গরীব, আমীর-ফকির সকলের সম্প্রীতির মাস। হিংসা, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা, অন্যায়-অপরাধ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসার মাস। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যপূর্ণ ভাব উদয়ের মাস। সিয়াম ধৈর্য্য ও সহমর্মীতার মাস। মুসলমানদের আখলাক বা চরিত্র ফুলের মত গঠন করে পারলৌকিক জীবনে শান্তির পথ পাওয়ার মাস। বেশি বেশি ইবাদত বন্দেগী করে অধিক সওয়াব হাসিলের মাস। ইসলামের পাঁচটি বেনার মধ্যে একটি রমজানের রোযা রাখা। একমাস সিয়াম সাধনা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপরে আল্লাহ তা’য়ালা ফরজ করেছেন। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্য ফেব্রæয়ারী মোতাবেক ২ হিজরীর মধ্য শাবান দিবসে আল্লাহু জাল্লা শানুহু সিয়াম বিধান নাযিল করেন। সিয়াম আরবী শব্দ। সিয়াম অর্থ- বিরত থাকা, উপবাস থাকা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছায় রোজার নিয়তে সুবহি হতে সুর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার, ইন্দ্রিয় তৃপ্তি হতে বিরত থাকার নাম- রোজা। আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হল যেমন বিধান দেওয়া হয়েছিল পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়া বা খোদাভীতি অবলম্বন করতে পারো।” সুরা- বাক্বারাহ, আয়াত-১৮৩
কোরআন পাকে আরো বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যারা রমজান মাস পাবে, অতঃপর তারা যেন একমাস রোজা রাখে। তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ্য হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে।” সুরা- বাক্বারাহ, আয়াত-১৮৫
উপরোক্ত কোরআনের আয়াত দ্বারা বুঝা যায় খোদাভীতি, পরহেজগারী অর্জনই রোজার আসল উদ্দেশ্য। অশ্লীল বেহায়া কাজ, পরনিন্দা, গীবত, কাম, ক্রোধ, লোভ, কু-চিন্তা, কু-দৃষ্টি থেকে বিরত না থাকলে পরিপূর্ণ সিয়াম সাধনা হবে না। শুধু সারাদিন রোজা রেখে ক্ষুধা পিপাসায় কাতর হওয়াই নামান্তর। রোজার মাধ্যমে খোদাভীতি সৎ গুণাবলীর বিকাশ সাধনই একমাত্র কাম্য। কাজেই রোজাদারের খাদ্য পানীয় বস্তু রুজি-রোজগার ইত্যাদি হালাল হতে হবে। নচেৎ হারাম খাদ্য বস্তু খেয়ে রোজা রাখলে প্রকৃত উদ্দেশ্য তাক্বওয়া অর্জিত হবে না। উপরোক্ত আয়াতের দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, রোজার মাধ্যমে হারাম কাজ বর্জনের জন্যই আল্লাহ তায়ালা রমজানের দীর্ঘ একমাস ফরজ করেছেন। হুজুরে পাক (সাঃ) হাদীসে ফরমান যে, “রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্ক আম্বরের অধিক সুগন্ধিযুক্ত”। হাদীসে আরো বর্ণিত আছে, “রোজা আত্মরক্ষার ঢাল স্বরূপ।” যুদ্ধ ক্ষেত্রে ঢাল ব্যবহার যেমন শত্রæর আক্রমণ হতে আত্মরক্ষা করা যায়। তদ্রæপ; মানুষ শরীয়ত সম্মত রোজা রেখে দোযখের আগুন হতে নিজেকে রক্ষা করে। স্বরণ রাখতে হবে রোজা রাখা অবস্থায় কোরআন হাদীসের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ কাজ, যাবতীয় কবিরাহ গোনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। বান্দা পাপ কার্য হতে বিরত না থাকলে শুধু উপবাস বলে বিবেচিত হবে। কাজেই এমন রোজা দোযখের আগুন হতে বাঁচানোর জন্য ঢাল স্বরূপ ব্যবহার হবে না। হাদীসে আরো বর্ণিত আছে, “তোমাদের মধ্যে কেউ যেন রোজা রাখা অবস্থায় অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ, ঝগড়া ফাসাদ এবং মুর্খের ন্যায় কাজ না করে। যদি কেউ রোজাদারের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে আসে সে যেন বলে আমি রোজাদার।” রোজাদারের মহাপুরষ্কারের কথা হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, “রোজা আমার জন্যই রাখা হয়, এর প্রতিদান আমিই প্রদান করবো।” এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে আল্লাহ যেমন মহান তাঁর প্রতিদানও তদ্রæপ একটি বিরাট দানই হবে। অন্য কোন ইবাদতের বেলায় এমনভাবে পুরষ্কারের কথা ঘোষণা করেননি। কাজেই রোজা একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ৩০টি রোজার মধ্যে অনেক গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা ৩০ রোজাকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন এবং মুমিনদের ইহার মূল রহস্য সম্বন্ধে অবগত করেছেন। এ জন্যই মুসলিম নর-নারীরা পূর্ব থেকেই প্রস্তুত হতে পুরোপুরি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে। পরকালে নাজাতের জন্য খোদার হুকুমের প্রতি মনযোগী হয়। হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে, রমজান মাসে সাতটি দোযখের দরজা বন্ধ করে আটটি বেহেশতের দরজা খোলে দেওয়া হয়। রমজানে মুমিন বান্দা গোনাহ থেকে মুক্তি পাবার জন্য শয়তানের পায়ে শিকল বেঁধে মহা সাগরে নিক্ষেপ করা হয়। আল্লাহ আমাদের প্রতি খুব মেহেরবান। যার কোন ইয়াত্তা নেই। রমজান মাসে একটি নফল ইবাদত করলে অন্য মাসের একটি ফরজ সমতুল্য। রমজান মাসের একটি ফরজ অন্য মাসের সত্তুরটি ফরজের সমতুল্য। অন্য মাসে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করলে প্রতিটি হরফে দশটি নেকি, রমজান মাসে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করলে সত্তরটি নেকি। রমজান মাসকে আল্লাহ তায়ালা তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগ রহমত। রমজানের প্রথম দশ দিনে আল্লাহ মুমিন বান্দাদের উপরে খাস রহমত বর্ষণ করেন। যার দ্বারা বান্দা আদর্শ সুন্দর চরিত্র মনের মধ্যে উদয় হয়। রহমতের মাধ্যমে খোদার প্রেমে গভীর সম্পর্ক হয়। বান্দাকে খোদা খুবই ভালোবাসেন কিন্তু বান্দা হুকুম আহকাম না মানার কারণে অসন্তুষ্টি থাকেন। কিন্তু রমজান মাসে বান্দা আল্লাহর কাছ থেকে করুণ সুরে প্রার্থনা করলে বান্দার উপর রহমত নাজিল করেন। রমজানের মধ্যভাগ মাগফিরাত। মাগফিরাত অর্থ- ক্ষমা। বান্দা সারা জীবন অগনিত কবিরা, সগিরাহ, জাহেরী, বাতেনী, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, আলোতে-অন্ধকারে, যত প্রকারের গোনাহ করুক না কেন যদি খাস দিলে তওবা করে প্রভুর কাছে মাফ চায় তাহলে রমজানের উছিলায় সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। রমজানের শেষভাগ নাজাত। নাজাত হচ্ছে- মুক্তি। সারা বিশ্বে যত মুসলমান আছে যদি আল্লাহর বিধান মেনে রমজানের সঠিক তারতীব ঠিক রাখে, আল্লাহ খুশি হয়ে বান্দাদেরকে দোযখের আগুন হতে মুক্তি দেন। বান্দার বেহেশতের পথ পরিষ্কার করেন। তাই রমজান মাসে বেশি বেশি করে নফল নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা, দরূদ পড়া, তওবা ইস্তেগফার পড়া। ইফতারের পূর্ব মুহুর্তে আল্লাহর কাছে দোয়া কবুল হয়। রোজাদারের দু’টি আনন্দ রয়েছে, একটি ইফতারের সময় আরেকটি সেহরীর সময়। কোন মুসলমান অপর ভাইকে ইফতার করালে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। কিন্তু ওই ব্যাক্তির সওয়াব সামান্য অংশ কমবে না। রোজার মাসটি ফযিলতের মাস। সারাদিন রোজা রাখার পর রাতে বান্দার উপর তারাবীর নামাজ আদায় করতে রাসুল (সাঃ) তাগীদ দিয়েছেন। তারাবীর নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ । তারাবীর নামাজ দু’ভাবে পড়া যায়, ত্রিশ পাড়া খতম করে বা সুরার মাধ্যমে। উভয় প্রকারের মাধ্যমে তারাবীহ আদায় করা সুন্নত। বেশি কোরআন খতম করলে অধিক সওয়াব। রমজান মাসে ২০ তারিখের পর বেজোড় রাত্রিতে আল্লাহ লাইলাতুল কদরের রাত্রি রেখে দিয়েছেন। ওই রাত্রিতে ইবাদত করলে হাজার মাস অপেক্ষা হতে উত্তম। রমাজনের শেষ বেজোড় রাত্রিতে কোন তারিখে শবেকদর তা নির্ধারিত নেই। ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ তারিখে শবে কদর হবে। তবে হানাফি মাযহাবের অভিমত শবে কদরের রাত্র ২৭ তারিখে হবে। সুতরাং কোন মুমিন ওই রাত্রির ইবাদত হতে গাফেল হলে তার মত হতভাগা নাই। মালদার নিসাব পরিমাণ অর্থাৎ সাড়ে বায়ান্ন তুলা রৌপ্য বা সাড়ে সাত তুলা সোনা বা সমপরিমাণ মাল থাকে তার উপর ফেতরা দেওয়া ওয়াজিব। ফেতরা ছাড়া ধনাঢ্য ব্যাক্তিদের রোজা কবুল হয় না। ফেতরা না দিলে বান্দার রোজা আকাশে উড়তে থাকে। ফেরেশতারা আল্লাহকে বলে ওই রোজাগুলো কবুল করেননি কেন? প্রতি উত্তরে খোদা বলেন, ফেতরা না দেওয়ার কারণে। এছাড়া রমজানে যাকাত, দান, সদকাহ করলে প্রচুর সওয়াবের আশা আছে। তাই আমরা মুসলিম সম্প্রদায় খোদার হুকুম পুরোপুরি পালন করে রমজানের পবিত্রতা বজায় রাখবো। দেশে কোন শরীয়ত বিরোধী কাজ যেমন গান-বাজনা অশ্লীল ছবি দুশ্চরিত্র মূলক কাজ ত্যাগ করবো। একজনের দ্বারা অন্যজনে কষ্ট না পায় সেদিকে খেয়াল রাখবো। ব্যবসায়ী বন্ধুরা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসকে কৃত্রিম সংকট বা মূল্যবৃদ্ধি না করে সেদিকে খেয়াল রাখবো। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের পুরোপুরি হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন

লেখক
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও প্রবীণ কলামিষ্ট
দেলোয়ার হোসেন
সাবেক শিক্ষক
জামিয়া গাফুরিয়া দারুসসুন্নাহ ইসলামপুর।
ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ।




আপনার মতামত লিখুন :

এক ক্লিকে বিভাগের খবর