দেশে একদিনে ৪২ মৃত্যুর রেকর্ড, নতুন শনাক্ত ২৭৪৩

0

নিজস্ব প্রতিবেদক,

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। করোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় একদিনে সর্বোচ্চ ৪২ জনের মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৮৮৮ জনে। এছাড়া এ সময়ে নতুন শনাক্তের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৪৩ জন। তাদের নিয়ে মোট শনাক্ত হলেন ৬৫ হাজার ৭৬৯ জন। আর নতুন সুস্থ হয়েছেন ৫৭৮ জন।

আজ রবিবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে যুক্ত হয়ে করোনাভাইরাস সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা।

তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ১২ হাজার ৮৪২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ১৩ হাজার ১৩৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নতুন পরীক্ষায় ২ হাজার ৭৪৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়। এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড। এর আগে গত ৫ জুন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়। সেদিন ২,৮২৮ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্তের কথা জানানো হয়। এর আগে গত ২ জুন এ যাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯১১ জনের করোনা শনাক্তের কথা জানানো হয়। এ পর্যন্ত ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৭ জনের করোনা পরীক্ষা করে দেশে মোট শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৬৫ হাজার ৭৬৯ জনে। ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২০.৮৮।

নাসিমা আরও জানান, এই সময়ে মৃত্যু বরণ করেছেন ৪২ জন। যা এ যাবত কালের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। তার আগে গত ৩১ মে একদিনে সর্বোচ্চ ৪০ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। এছাড়া, গতকাল (৬ জুন), ৪ জুন ৩৫, ৩ জুন ৩৭ জন, তার আগের দিন ২ জুন ৩৭ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল। গত ৩০ মে ২৮ জন, ২২ মে ২৪ জনের, গত ১৮, ১৯ ও ২৫ মে একদিনে সর্বোচ্চ ২১ জন ও ২২ মে ২২ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল। এ নিয়ে মোট মৃত্যু ৮৪৬ জনের। নতুন মৃতদের মধ্যে পুরুষ ৩৫ জন ও নারী ৭ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই মারা গেছেন ২৭ জন। আর চট্টগ্রামে ৭জন।

তিনি আরও বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন সুস্থ হয়েছেন ৫৭৮ জন। এ নিয়ে মোট ১৩ হাজার ৯০৩ জন সুস্থ হয়েছেন। ব্রিফিংয়ের করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেননিজস্ব প্রতিবেদক,

রাজধানীসহ সারাদেশে করোনা রোধ করতে এবার সংক্রমণের হারের ওপর ভিত্তি করে লাল, হলুদ ও সবুজ (রেড, ইয়েলো ও গ্রিন) জোনে ভাগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেছে সরকার।

বিশেষ করে যেসব এলাকায় বেশি করোনা রোগী শনাক্ত সেসব এলাকা রেড জোনের আওতায় এনে লকডাউন ঘোষণা করা হচ্ছে।

রবিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেশের তিনটি বিভাগ, ৫০টি জেলা ও ৪০০টি উপজেলাকে পুরোপুরি লকডাউন (রেড জোন বিবেচিত) দেখানো হচ্ছে। এছাড়া আংশিক লকডাউন (ইয়েলো জোন বিবেচিত) দেখানো হচ্ছে পাঁচটি বিভাগ, ১৩টি জেলা ও ১৯টি উপজেলাকে।

এর বাইরে লকডাউন নয় (গ্রিন জোন বিবেচিত) এমন জেলা দেখানো হচ্ছে একটি এবং উপজেলা দেখানো হচ্ছে ৭৫টি।

এসব অঞ্চলে বা এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি ও আইনি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সকল প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

গত ১ জুন সরকারের বেশকয়েকটি দপ্তরের মন্ত্রী, সচিব ও পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের বৈঠক হয়। বৈঠকে এলাকা ভিত্তিক লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আজ থেকে কাজ শুরু হয়েছে। দেশে ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি চললেও তাতে করোনা সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হয়নি। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে করোনার সংক্রমণ।
যেসব এলাকা লকডাউন: মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে শনিবার সর্বশেষ আপডেট করা তালিকায় বরিশাল বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরকে। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন ভোলা ও ঝালকাঠি।

ঢাকা বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন করা হয়েছে গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইলকে। এই বিভাগে শুধু ঢাকা ও ফরিদপুর আংশিক লকডাউন।

চট্টগ্রাম বিভাগে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে- ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনী, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীকে। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি।

খুলনা বিভাগের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা, মেহেরপুর, নড়াইল ও সাতক্ষীরাকে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন বলা হচ্ছে বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও মাগুরাকে। খুলনা বিভাগেই দেশের একমাত্র গ্রিন জোন চিহ্নিত জেলা ঝিনাইদহ, অর্থাৎ এটি লকডাউন নয়।

রাজশাহী বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীকে। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ।

রংপুর বিভাগের আটটি জেলাকেই পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে। জেলাগুলো হলো- দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও।

সিলেট বিভাগের সবকটি জেলাকেই বলা হচ্ছে পুরোপুরি লকডাউন। বিভাগের জেলাগুলো হলো- হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও সিলেট।

ময়মনসিংহ বিভাগেরও সবকটি জেলাকে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে। এ চারটি জেলা হলো জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর।

এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকায় প্রতি এক লাখে যদি ৩০ জন বা এর বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত থাকে তবে সেটাকে রেড জোন বলা হবে। তিন জনের বেশি কিন্তু ৩০ জনের কম থাকলে তবে সেই এলাকাকে ইয়েলো জোন বলা হবে। এক বা দুজন বা কেউ না থাকলে সেটাকে গ্রিন জোন বলা হবে। এছাড়া গ্রিন জোনে সতর্কতা এবং ইয়েলো জোনে সংক্রমণ যেন আর না বাড়ে সেজন্য পদক্ষেপ থাকলেও রেড জোনে করোনার বিশেষ গাইডলাইন অনুযায়ী কঠোর হবে পুলিশ। অধ্যাপক নাসিমা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, করোনা মোকাবিলায় তরল খাবার, কুসুম গরম পানি ও আদা চা পান করতে হবে। সম্ভব হলে মৌসুমী ফল খাওয়া ও ফুসফুসের ব্যায়াম করা। এ সময় ধূমপান ত্যাগ করতে হবে। কারণ, এটি ফুসফুসের কার্যকারীতা নষ্ট করে দেয়।

চীনের উহান থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনা বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। সেদিন তিনজনের শরীরে করোনা শনাক্তের কথা জানিয়েছিল আইইডিসিআর।

এর ১০ দিন পর ১৮ মার্চ করোনায় প্রথম মৃত্যুর খবর আসে। দিন দিন করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ায় নড়েচড়ে বসে সরকার।

ভাইরাসটি যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় সব সরকারি-বেসরকারি অফিস। কয়েক দফা বাড়ানো হয় সেই ছুটি, যা এখনও অব্যাহত আছে। ৭ম দফায় বাড়ানো ছুটি চলে ৩০ মে পর্যন্ত। ৩১ মে থেকে সাধারণ ছুটি নেই। তাই অফিস আদালতে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় সরঞ্জামাদি রাখা ও সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপর গুরত্ব দেয়া হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে।

এদিকে, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সংখ্যা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান রাখা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারের পরিসংখ্যান বলছে, রবিবার সকাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাসে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার লাখ দুই হাজার ৪৭ জন। করোনা নিয়ে লাইভ আপডেট দেয়া ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটার থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেখা যায়, করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৯ লাখ ৭৩ হাজারেরও বেশি। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৪৩ জন। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়েছেন ৩৪ লাখ ১১ হাজার ৯৮ জন।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার দিক থেকে এখনও শীর্ষ আছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৯৬ জনের। সুস্থ হয়েছেন ৭ লাখ ৫১ হাজার ৮৯৪ জন।

আক্রান্তের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে ব্রাজিল। সেখানে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৮৩০ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩৬ হাজার ২৬ জনের। রাশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৯ জন, মৃত্যু হয়েছে ৫৭২৫ জনের। স্পেনে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৭ হাজার ১৩৫ জনের।

মৃত্যুর দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্রিটেন। দেশটিতে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪০ হাজার ৬৫ জনের, আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৮ জন। এছাড়া ইতালিতে নিহত হয়েছেন ৩৩ হাজার ৮৪৬ জন।

%d bloggers like this: