ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখবেন যেভাবে

0

স্বাস্থ্য ডেস্ক :

বিশ্বের প্রায় ৪০ কোটি মানুষ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। আর এর মধ্যে ৯০ শতাংশই আক্রান্ত টাইপ ২-তে। রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে শরীরে কি ধরনের সমস্যা হয় তা সম্পর্কে আমরা কমবেশি সকলেই অবগত। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয় ডায়াবেটিস রোগে। প্রতি বছর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এই রোগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

ডায়াবেটিস সাধারণত তিন প্রকারের হয়। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে গেলে ডায়াবেটিস রোগের শিকার হই আমরা। ইনসুলিন হরমোনের উৎপাদন রক্তে কমে গেলে ডায়াবেটিস জাঁকিয়ে বসে শরীরে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস খুব কমবয়সে হতে পারে। শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর তা কিছুটা নির্ভর করে। অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস সাধারণত চল্লিশের কোঠা পেরোনোর পর হয়ে থাকে।

ডায়াবেটিসের লক্ষণ

চিকিৎসকদের মতে, শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে তা কিডনিতে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে শরীর থেকে সুগার বের করে দেয়ার জন্য। সে কারণেই ঘন ঘন প্রস্রাব পায়।

ডায়েট বা ব্যায়াম না করেই হুট করে অনেক বেশি ওজন কমতে থাকা শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

খুব অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা শরীরে সুগারের মাত্রা বৃদ্ধির লক্ষণ। সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে শরীরে পানির ঘাটতি হয়। আর ডিহাইড্রেশনের ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।

পানি পান করা শরীরের জন্যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু যদি আপনি দেখেন যে আপনার এই পানির তেষ্টা স্বাভাবিক মাত্রার থেকে অনেক বেশি বেড়ে গেছে, তাহলে বুঝতে হবে যে শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা কমতে শুরু করেছে।

ডায়াবেটিসের একটি সাধারণ লক্ষণ হলো ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া। যেকোনো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষুধাভাব স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে যায়। এই ধরনের লক্ষণ দেখলে অবশ্যই ডায়াবেটিস টেস্ট করা উচিত।

মানুষের শরীরে জখম, কাটা ছেড়া বা ঘা যখন তখন হতে পারে, কিন্তু শরীরে থাকা প্লেটলেট রক্তকণিকা এবং এন্টি অক্সিডেন্ট খুব সহজেই সেগুলো নিজে থেকে শুকিয়ে ও সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিস হলে এই জখম বা ঘা সহজে শুকাতে চায় না।

শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা কম হতে শুরু করলে চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ আবছা হয়ে আসে। ফলে চোখের পাওয়ার বেড়ে যেতে পারে। এই সময় ডায়াবেটিস পরীক্ষা অবশ্যই করানো প্রয়োজন।

যাদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস হয়ে থাকে তাদের মধ্যে অহরহ মেজাজ পরিবর্তন, বিরক্তি বা রেগে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। আবার যাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়ে থাকে তাদের মধ্যে সারাক্ষণ বিষণ্নতা, হাত-পা কাঁপা এবং ধীর গতিতে কাজ করার প্রবণতা দেখা দেয়।

ডায়াবেটিস রোগে মুখের ভিতরের অংশ বারবার শুকিয়ে যায়। ডায়াবেটিসের ফলে শুকনো মুখ হলে তা আরও নানা সমস্যা তৈরি করে। দাঁত ও মাড়ির সমস্যা হয় শুকনো মুখে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর যৌন অক্ষমতা তৈরি হয়। তিন-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষরা সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম হন।

এই রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। ফলে যেকোনো রোগের সংক্রমণ সহজেই হতে পারে শরীরে।

গলা, কুঁচকি, বগল ইত্যাদি জায়গার চামড়ার রং গাঢ়় হয়ে যায়। ডায়াবেটিস হলে ত্বকে চুলকানি অনুভূত হয়।

ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয়

সাধারণত একজন সুস্থ লোকের রক্তের প্লাজমায় গ্লুকোজের মাত্রা খাবার আগে ৫.৬ মিলি মোলের কম বা খাবার ২ ঘন্টা পর ৭.৮ মিলি মোলের কম থাকে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির যদি রক্তের প্লাজমায় গ্লুকোজের মাত্রা খাবার আগে ৭.১ মিলি মোলের বেশি থাকে বা খাবার ২ ঘন্টা পর ১১.১ মিলি মোলের বেশি থাকে। তবে ঐ ব্যক্তি ডায়াবেটিস আক্রান্ত গণ্য হবে।

যেসব পানীয় পানে নিয়ন্ত্রণে থাকে ডায়াবেটিস

করল্লার জুস

তেতো সবজি হিসেবে করল্লাকে এড়িয়ে চলেন অনেকেই। অথচ তা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে দারুণ কাজ করে! করল্লার জুস শরীরের ইনসুলিনকে সক্রিয় করে তোলে। ফলে ব্লাড সুগার সঠিক উপায়ে খরচ হয়, চর্বিতে রূপান্তরিত হয় না। এতে ওজনও কমে। অন্যদিকে এ জুসে থাকে কারানটিন নামের উপাদান যা সরাসরি ব্লাড সুগার কমায়। প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস কাচা করল্লার জুস আপনার কাজে আসতে পারে।

মেথি পানি

এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক গ্লাস গরম পানিতে ১০ গ্রাম মেথি ভিজিয়ে রেখে পরে সেই পানি পান করলে টাইপ-টু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। এই পানি ব্লাড সুগার কমায়, হজম ধীর করে, শর্করা এবং চিনি শরীরে শোষিত হতে সাহায্য করে।

বার্লি

বার্লিতে প্রচুর ফাইবার বা খাদ্য আঁশ থাকে, এ কারণে তা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য উপকারী। তা রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্থিতিশীল করে। তবে উপকার পেতে হলে অবশ্যই চিনি না মিশিয়ে বার্লি পান করতে হবে। বার্লিতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে বলে তা অন্যান্য রোগকেও দূরে রাখে।

গ্রিন টি

বিএমসি ফার্মাকোলজি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, সুস্থ এবং ডায়াবেটিস- উভয় ধরনের ইঁদুরেই ব্লাড সুগার কমায় গ্রিন টি। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

সুগার (ডায়াবেটিস) নিয়ন্ত্রণ করার উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ। প্রতিদিন সকালে ও রাতে ২ দিন খালি পেটে ১ চামচ জিরা ভেজানো ১ গ্লাস পানি খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া প্রতিদিন খালি পেটে সকালে অ্যালোভেরার জুস খাওয়া যেতে পারে।

২ ঘন্টা পর পর গ্রিন টি, ক্রীমক্রেকার বিস্কুট খেতে পারেন। বেলা ১১টায় রুটি, সবজি, ডিম সিদ্ধ ও ফল খাওয়া যেতে পারে। দুপুরের মেন্যুতে ভাত, মসুরের ডাল, সোয়াবিন, রাজমা, মাছ, ডিম, মাংস ও সবুজ শাক-সবজি রাখতে পারেন। বিকেলে বা সন্ধ্যায় গ্রিন টি, মুড়ি, বিস্কুট খেতে পারেন। রাতের মেন্যুতে ভাত, রুটি, সবজি, মাছ বা ডিম খাওয়া যেতে পার।

যেকোনো রোগকে কন্ট্রোলে রাখতে ব্যায়াম বা শরীরচর্চা খুবই কার্যকরী উপায়। সুগার রোগীর ক্ষেত্রে ও সুগার নিয়ন্ত্রণে ব্যায়াম বা শরীর চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে প্রতিদিন যদি নিয়ম করে একটু হাঁটা যায় রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয় এবং তাতে শরীর যথেষ্ট অ্যাক্টিভ ও সুস্থ থাকে। ডাক্তারদের পরামর্শ , যত হাসিখুশি, টেনশন মুক্ত থাকবেন ততই ডায়াবেটিস নামক ব্যামো আপনার থেকে দূরে থাকবে।

 

%d bloggers like this: