ঝিনাইদহে উপমহাদেশের প্রখ্যাত পীর দাদা হুজুর কেবলার ওফাত দিবস পালিত

0

মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:

যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্বীর্য্য পরিবেশের মধ্য দিয়ে ১৮.০৩.২০১৮ ইং রোববার উপ মহাদেশের প্রখ্যাত পীর মুজাদ্দেদে জামান কুতুবুল আলম হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহ) এঁর ৭৯ তম ওফাত দিবস পালিত হয়।

এ উপলক্ষ্যে ঝিনাইদহ শহরের ব্যাপারীপাড়া সায়াদাতিয়া খানকাহ শরীফে এক দোয়া ও মিলদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। দোয়ার অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মাওলানা হাসান মাহমুদ। এছাড়া বাংলাদেশের ঢাকা ও খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে দোয়া ও জিকিরের মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

ভারতের ফুরফুরা দরবার শরীফেও দাদা পীরের ওফাত দিবস উপলক্ষ্যে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩৯ সালের এই দিনে ৯৬ বছর বয়সে উপ মহাদেশের বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক ও সমাজ সংস্কারক দাদা হুজুর কেবলা নামে পরিচিত প্রখাত পীর আবু বকর সিদ্দিকী (রহ) পর্দা নেন। ওফাত দিবস পালনের প্রাক্কালে জমিয়তে জাকেরিণের মুখ্য নির্দেশক ন’হুজুর পীর কেবলা (রহঃ) পৌত্র ও পীর আল্লামা বাকী বিল্লাহ সিদ্দিকী (রহ:) এঁর একমাত্র সাহেবজাদা পীরজাদা আল্লামা জবিহুল্লাহ সিদ্দিকী (মাদ্দাঃ) দাদা পীরের মত ও পথের উপর দৃড় থাকার জন্য তাঁর ভক্ত অনুরাগী ও মুরিদানদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। পশ্চিম বঙ্গের হুগলী জেলার জাংগী পাড়ার ফুরফুরা শরীফ একটি ঐতিহাসিক স্থান১৮৪৫ খৃস্টাব্দে ঐতিহ্যবাহী সিদ্দীকী পরিবারে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করেন তিনিই হচ্ছেন হযরত মওলানা শাহ্ সূফী আবূ বকর সিদ্দিকী (রহঃ), পরবর্তীতে যিনি উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পীর হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সাধারণত তিনি দাদা হুজুর কেবলাহ নামে মশহুর।

মুজাদ্দিদ-ই যামান, আমীরুশ শরীআত হিসাবে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন। মুজাদ্দিদ-ই যামান অর্থ যুগ-সংস্কারক। তার আবির্ভাব কালটা ছিল ব্রিটিশ আমল।

সে কালে এদেশের মুসলিম সমাজে র্শিক, বিদা’আত, কুসংস্কার, কুফর, অন্ধবিশ্বাস এমনভাবে অনুপ্রবেশ করেছিল যে, একজন মুজাদ্দিদ বা সংস্কারকের প্রয়োজন প্রকট হয়ে উঠেছিল। সেই সময়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) এঁর বংশধারায়। এই বংশধারা সিদ্দীকী খান্দান নামে পরিচিত হয়।

এই সিদ্দীকী খান্দান হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)’র ছেলে মুহাম্মদ থেকে উৎসারিত হয়েছে। তাঁর পুত্র কাসেম মিসরে ছিলেন। কালক্রমে এই বংশের উত্তর পুরুষ খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে আসেন। এই বংশের হযরত মনসুর বাগদাদী এক সৈন্যবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে তদানীন্তন বাংলায় আসেন এবং বালিয়া বাসন্তী নামক স্থানে এক যুদ্ধে জয়ী হন।

যুদ্ধে জয়ী হওয়ায় বালিয়া বাসন্তীর নামকরণ হয়ে যায় ফারে ফারা অর্থাৎ পূর্ণ আনন্দ, যা কালক্রমে হয়ে যায় ফুরফুরা নামে। হযরত মনসুর বাগদাদী (রহঃ)-এর ষষ্ঠদশ অধস্তন পুরুষ হিসেবে হযরত মওলানা শাহ্ সূফী আবূ বকর সিদ্দীকী জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। আম্মার আগ্রহেই তিনি লেখাপড়া করেন এবং সেকালে মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রী জামা’আতে উলা হাসিল করেন।

তিনি হযরত সৈয়দ আহমদ বেরেলবী (রহঃ) এঁর খলীফা হাফেজ জামালুদ্দীন (রহঃ)-এর তত্ত্বাবধানে তফ্সীর, হাদীস ও ফিক্াহ এবং মওলানা বিলায়েত (রহঃ)-এর তত্ত্বাবধানে মানতিক ও হিকমত বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রীর বিশেষ সনদ প্রাপ্ত হন।

মদীনা শরীফে গিয়ে রওযা মুবারকের খাদেম বিখ্যাত আলিম শায়খুদ্দালাইল আমীন বিদ্ওয়ান (রহঃ)-এর কাছে তিনি তালীম সিহা সিত্তাসহ চল্লিশখানা হাদীস গ্রন্থের সনদ লাভ করেন। তারপর তিনি দেশে ফিরে এসে বিশিষ্ট ফারসী কবি বিখ্যাত পীর সূফী ফতেহ্ আলী ওয়াইসী (রহ) এঁর মুরীদ হন এবং কামালিয়ত হাসিল করেন। তিনি খিলাফতের সনদ লাভ করেন।

অচিরেই পীর হিসেবে তাঁর খ্যাতি অবিভক্ত বাংলা-আসামের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে লোক এসে তাঁর নিকট মুরীদ হতে থাকেন। তাঁ পরশে বহু লোক সত্যিকার সূফী হয়ে যান। অবিভক্ত বাংলা-আসাম ছাড়াও আরব দেশেও তাঁর খ্যাতি বিস্তৃৃত হয়।

তিনিই মূলত অবিভক্ত বাংলায় ইসালে সওয়াব ও ওয়াজ মাহফিলের ব্যাপক প্রসার ঘটান। তিনি ১৮৯০ খৃস্টাব্দে ফুরফুরা শরীফে ২১, ২২ ও ২ শে ফাল্গুন ইসালে সওয়াব ও ওয়াজ মহফিল প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে মানুষ হিদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারে। তিনি বাংলা-আসামের শহর, গঞ্জ গ্রাম-গ্রামান্তরে গিয়ে ওয়াজ, মিলাদ ও কিয়ামের মাধ্যমে পথভ্রষ্ট মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিতেন।

%d bloggers like this: