ঢাকা ২৭°সে ১৫ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আরমানিটোলায় আগুন ॥ নিহত ৪ দগ্ধ ৩০

রাজধানীর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় রাসায়নিক দ্রব্যের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চারজন নিহত হয়েছেন। দগ্ধ হয়েছেন আরো অন্তত ৩০ জন। হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন আরও চারজন। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৩টার দিকে হাজী মুসা ম্যানশন নামের একটি ভবনের নিচতলায় এই অগ্নিকান্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের প্রায় ৬ ঘণ্টার চেষ্টায় গতকাল শুক্রবার সকালে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবি আই) কর্মকর্তারা। তারা ঘটনাস্থলে আশেপাশের এলাকা ঘুরে দেখেন। পরিদর্শন শেষে সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, আগুনের সূত্রপাত কেমিক্যাল গোডাউন থেকে হতে পারে। এসব দোকানে কেমিক্যাল বিক্রি হতো। ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা রাসেল শিকদার জানান, গতকাল সকাল ১১টার দিকে আরও দুজনের দগ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, পাঁচতলার মেঝেতে দুজনের লাশ পাওয়া যায়। তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মাহফুজ রিভেন বলেন, নিহতের মধ্যে একজন সুমাইয়া আক্তার (২২) বলে জানা যায়, আরেকজন নিরাপত্তাকর্মী। এনিয়ে এই ঘটনায় এক নারীসহ চারজনের মৃত্যু হলো।
অগ্নিদগ্ধ ২১ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে আছেন। বাকি ১৬ জন বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে মোস্তফা নামে একজন চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। ভর্তি ২০ জনের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। এদের মধ্যে দু’জনের ফিজিক্যাল বার্ন। ওই নারীকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পিবিআইর অতিরিক্ত উপকমিশনার কামরুল ইসলাম বলেছেন, ভবনটির নিচতলায় দোকান রয়েছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ভবনের নিচতলায় পেছনের দিকে বেশ কয়েকটি দোকানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনটির নিচতলার ৫-৬টি দোকান আগুনে প্রায় পুরোটাই পুড়ে গেছে। দোকান ও গুদামের ভেতরে বড় বড় ড্রামগুলো পুড়ে গেছে। এ ছাড়া রাসায়নিক পণ্য কেনাবেচায় ব্যবহৃত কিছু ছোট ছোট কনটেইনারও দেখা গেছে। তবে ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আগুনের সূত্রপাত নিয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু বলেননি। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত, তা তদন্ত করে দেখা হবে। তারা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন বলেও জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ভাস্কর দেবনাথ বলেছেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি দল ঘটনাস্থলে আসবে। তারা পরীক্ষা করে দেখবে রাসায়নিক থেকে আগুন লেগেছে কি না এবং ভবনের দোকানগুলোতে এ ধরনের পদার্থ আছে কি না। আগুন লাগার আর কোনো ঝুঁকি আছে কি না। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, রাত সোয়া তিনটার দিকে ওই ভবনে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট ৩ ঘণ্টার চেষ্টার পর আজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। ওই ভবনের পাশের একটি ভবনের একজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ওই ভবনের নিচে রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। তার দাবি, আশপাশের প্রায় সব ভবনেই এ ধরনের গুদাম রয়েছে।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক চিকিৎসক সামন্ত লাল সেন জানান, সেখানে চিকিৎসাধীন চারজনের শরীরের ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান জানান, ভবনের বাসিন্দাদের জানালার গ্রিল কেটে বের করে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো বোঝা যায়নি। ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিটি গঠন করবে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, আগুন লাগার পরপর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় ভবনের নিচতলা। ধীরে ধীরে ধোঁয়া উঠতে থাকে ওপরের দিকে। এতে ওপরের তলার বাসিন্দারা আগুনের বিষয়টি টের পান। এ সময় মানুষ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেও ধোঁয়া ও আগুনের কারণে বের হতে পারেননি। তারা ওপরের দিকে উঠতে থাকেন। তবে ভবনের ছাদ তালাবদ্ধ থাকায় কেউ ওপরে উঠতে পারেননি। বিভিন্ন ফ্লোরে আটকে থাকা লোকজন চিৎকার করতে থাকেন। আটকে পড়া বাসিন্দারা বারান্দা ও জানালা থেকে মোবাইলের আলো জ্বেলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। ভোর পৌনে ৫টার দিকে বিভিন্ন ফ্লোর থেকে অন্তত ১৩-১৪ জনকে ক্রেন ব্যবহার করে বের করে আনেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তারা বারান্দার গ্রিল কেটে বাসিন্দাদের উদ্ধার করেন। পরে একে একে আটকে পড়া সবাইকে উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

এদিকে গতকাল দুপুর সোয়া দুইটায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দগ্ধদের দেখতে এসে ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিদগ্ধ হয়ে যারা মারা গেছেন সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা জেলা প্রশাসন তাদের ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশংকাজনক। তবুও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের সেবায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আগুন নিয়ন্ত্রণে ও আটকা পড়া বাসিন্দাদের উদ্ধার করতে গিয়ে চার ফায়ার সার্ভিস কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশংকাজনক।’




আপনার মতামত লিখুন :

এক ক্লিকে বিভাগের খবর