ঢাকা ২৮°সে ১৫ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আট দিনের ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ শুরু, ঘরমুখো মানুষের স্রোত

নিউজ ডেস্কঃ

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে আজ একযোগে শুরু হয়েছে আট দিনের ‘সর্বাত্মক লকডাউন’। এ সময়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাত্রায় ১৩ দফা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার।

সেই মোতাবেক কলকারখানা ও অত্যাবশ্যকীয় কার্যক্রম ছাড়া সবকিছুই বন্ধ থাকছে। এ দীর্ঘ ছুটির ঘোষণায় গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা ছেড়েছে কর্মহীন ও নিম্ন আয়ের হাজারো মানুষ। মঙ্গলবারও মহাসড়কে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া ঘরমুখো মানুষের স্রোত বইছিল। পদে পদে নানা দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন তারা। কারণ এদিন ছিল নয় দিনের নিষেধাজ্ঞার সমাপ্তি। তাই চলেনি দূরপাল্লার গণপরিবহণ।

এমন পরিস্থিতিতে মাইলের পর মাইল হেঁটে এক পরিবহণ থেকে আরেকটিতে ভেঙে ভেঙে নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটে চলেছে। বিকল্প বাহন হিসাবে ভাড়ায় চালিত প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ট্রাক, পিকআপ ও লেগুনায় চড়ে ঢাকা ছেড়েছেন এসব মানুষ। পুলিশের কড়াকড়িতে পরিবহণ কমে যাওয়ায় গতকাল গাবতলী থেকে অনেক মানুষকে হেঁটে রওয়ানা হতে দেখা গেছে।

এ অবস্থায় করোনা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু যাত্রাপথেই নয়, এ সংক্রমণ দেশের গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

‘সর্বাত্মক লডাউন’ আজ ভোর ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে। এ আট দিন গণপরিবহণ-বাস, ট্রেন, লঞ্চ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ থাকবে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে (কর্ম এলাকা) থাকতে হবে। অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। কৃষিশ্রমিক পরিবহণ ও গণমাধ্যমসহ সব ধরনের জরুরি পরিষেবা চালু থাকবে। তবে শিল্পকারখানা, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারসহ জরুরি সেবা শর্তসাপেক্ষে চালু থাকবে।

এদিকে সরেজমিন ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সায়েদাবাদ ও গাবতলী এলাকা দিয়ে ঢাকা ছেড়ে গেছেন হাজারো মানুষ। গত নয়দিনের টানা বিধিনিষেধ মেনে গতকালও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ ছিল।

এ কারণে ঘরমুখো এসব মানুষ প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ট্রাক, পিকআপ ও লেগুনায় চড়ে মানুষকে ঢাকা ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। এসব স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ ভাড়া দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় অনেকে তাৎক্ষণিক বাড়ি থেকে টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে রওনা দেন।

গণপরিবহণ সংকটের কারণে গতকাল অনেককে হেঁটে ঢাকা ছেড়ে গ্রামমুখো ছুড়ে চলতে দেখা গেছে। যত কষ্টই হোক তারা বাড়ি পৌঁছবেন, এমন পণ করে তারা রওয়ানা হয়েছেন। এসব মানুষের আশা ছিল মহাসড়কে তারা কোনো না কোনো পরিবহণ পাবেন।

বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কেন বাড়ি যাওয়া-এমন প্রশ্নের জবাবে ঘরমুখো মানুষেরা জানিয়েছেন, রোজা শুরু হয়েছে। সামনে ঈদ। এ সময় লকডাউন শুরু হওয়ায় তাদের কর্মস্থল বন্ধ হয়ে গেছে।

আর লকডাউনের সময় আরও বাড়তে পারে এমন কথা শুনছেন। এজন্য তারা বাড়ি চলে যাচ্ছেন। কেননা, এ সময় তারা ঢাকায় থেকে জীবন চালাতে পারবেন না। এখানে সবকিছুর দাম বেশি। তাই এ সময়ে ঘরে ফিরে গেলে ‘ডালভাত’ খেয়ে হলেও জীবন বাঁচাতে পারবেন।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের সামনে কথা হয় কুমিল্লার রহিম মোল্লার সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকায় একটি কোম্পানির পিয়ন পদে চাকরি করি। লকডাউনের কারণে অফিস বন্ধ এবং অফিস থেকে জানানো হয়েছে ঈদের আগে হয়তো অফিস খুলবে না। এজন্য তিনি বাড়ি চলে যাচ্ছি। এ সময় ঢাকায় থেকে তিনবার খেতে ১৫০ টাকা লাগবে। আর চা, পান খেতে আরও খরচ হবে। এজন্য বাড়ি চলে যাচ্ছি। সবকিছু খুললে আবার ফিরে আসব।’

পাবনার বেড়ার উদ্দেশে বছিলা থেকে রওয়ানা হয়েছে সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, লকডাউনের কারণে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ সময় এখানে বসে থেকে সময় কাটানো দুরূহ হয়ে পড়বে। এছাড়া খাওয়া খরচসহ নানাবিধ খরচের ধকল সইতে হবে। এজন্য বেরিয়ে পড়েছি। আশা করি কোনো না কোনো গণপরিবহণ পেয়ে যাব।

জানতে চাইলে গাবতলী টার্মিনাল এলাকার ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট ফয়সাল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিনের তুলনায় গাবতলীতে সকাল থেকে গ্রামমুখো মানুষের ভিড় বেশি। মানুষ যে যার মতো করে সামনে এগুচ্ছেন। বিকল্প যানবাহন না পেয়ে হেঁটে গাবতলী এলাকা পার হচ্ছেন যাত্রীরা। এসব যাত্রী আমিন বাজার, হেমায়েতপুর বা সাভার এলাকা থেকে যেসব পরিবহণ পাচ্ছেন, সেসবে চড়ে তারা নিজ নিজ গন্তব্যে যাচ্ছেন।

কয়েকজন গ্রামমুখো মানুষ জানান, গাবতলী থেকে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত মাথাপিছু ট্রাক, পিকআপে ৩০০ টাকা করে নিচ্ছেন। মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকারে ৬০০ টাকা, ১০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যার কাছ থেকে যত নিতে পারছেন, তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

শিমুলিয়া, পাটুরিয়া ঘাটে ফেরিতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। লোকে লোকারণ্য এসব ফেরিতে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিল না। হুড়োহুড়ি করে ফেরিতে ওঠা ও নামার সময় রীতিমতো যুদ্ধ করেছেন ঘরমুখো মানুষেরা। ফেরিতে জায়গা না পেয়ে ট্রলারে করে অনেক মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, দেশের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালে বেড খালি নেই, আর রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তখন চোখের সামনে অনেক মৃত্যু দেখতে হবে আমাদের।

তিনি বলেন, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতির সময়ে এ দেশগুলোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্রীয় শক্তিশালী কাঠামো থাকায় তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে। কঠোর লকডাউন তাদেরকে এ কাজ সামাল দিতে সহায়তা করেছে।

তিনি আরও বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে লকডাউন একটি সহজ কাজ। এতে দেশের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ সময় কিছু প্রজ্ঞাপন ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। সেজন্য আমাদের সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালীর কারণে গার্মেন্ট, ব্যাংকসহ বিভিন্ন সেবা সার্ভিস খোলা রেখে এমন লকডাউন তেমন কোনো সুবিধা দিতে পারছে না। এমন সিদ্ধান্তের কারণে যদি মৃত্যু, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসে তাহলে আমাদের দ্বিগুণ ক্ষতি হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লকডাউন ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ আগে সরকারের কিছু পরিকল্পনা নেওয়ার দরকার ছিল। সরকারের ঘোষিত বিধিনিষেধ ও ব্যবস্থাপনা দেখে সেসবের অনুপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। সেটা না হলে গার্মেন্টস, ব্যাংক খোলা রেখে লকডাউন দেওয়া হয়। এ সময় খেটে খাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার উপায় কী হবে, সেটার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা হয়।

এ কারণে এবার আগামীকাল (আজ) থেকে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’র ঘোষণা শুনে মানুষ যেভাবে ঢাকা ছেড়ে গেছে তাতে করে সংক্রমণ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। পথে পথে তারা সংক্রমণ ছড়াতে ছড়াতে দেখা গেছে। দেশের ৮০ হাজার জনপদে এসব মানুষ সংক্রমণ ছড়াবে এটা বলাই যায়। কেননা, এ সময়ে যেসব মানুষ ঢাকা ছেড়ে গেছে, তাদের একজন হলেও এসব জনপদে যাবে।




আপনার মতামত লিখুন :

এক ক্লিকে বিভাগের খবর