চাটমোহরে শুরু হয়েছে উপমহাদেশের বিখ্যাত চড়কমেলা

0

পাবনা প্রতিনিধি : উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীণতম ও বিখ্যাত চড়ক মেলা তথা চড়ক উৎসব আজ ১৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার চাটমোহর উপজেলার বোঁথর গ্রামে শুরু হয়েছে। উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বড়াল নদী। সেই নদীপাড়ের একটি গ্রামের নাম বোঁথড়। গ্রামটির বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় বসে উপমহাদেশের বিখ্যাত চড়কমেলা। চৈত্র সংক্রান্তির তিথিতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা দূর-দূরান্ত এমনকি ভারত থেকে এই মেলা দেখতে এসেছেন বোঁথড় গ্রামে। হাজার হাজার মানুষের পদচারনায় উৎসব আমেজে মুখরিত হয়ে উঠবে শান্ত সুনিবিড় বোঁথড় গ্রামটি। বাড়ীতে বাড়ীতে ধর্ম নিঃবিশেষে জামাই-মেয়ে এসে ভরে গেছে মেলা উপলক্ষে। দূরের আতœীয়-স্বজনও বাদ যাবে না। আর নতুন জামাই-মেয়েকে ইলিশ মাছ খাওয়ানোর প্রথা বহুদিনের। জনশ্রুতিতে অনেকে এটাকে জামাই মেলা বলতেও পছন্দ করেন। যদিও এটা আসলেই চড়কপূজা। একদা নদীপাড়ের গ্রামটির অধিকাংশ মানুষই ছিলেন নিম্মবর্নের হলদার আর সূত্রধর সম্প্রদায়ের। তাই সঙ্গতঃকারনেই এই মেলাটির তারাই ছিলেন প্রধান আয়োজক। তখন শহরের উচ্চবর্নের বাবু সমাজ ছিলো দর্শক মাত্র। কালক্রমে হিন্দুবাবু সমাজ চড়ক পূজানুষ্ঠানটির এখন নেতৃত্বে আসীন হয়েছেন। আর হলদার সূত্রধররা অনুষ্ঠানের অনুসঙ্গ হয়ে পড়েছেন।
আগে ৭ দিন চলতো মেলা। এখন পরিধি ও জৌলুস কমে ৩ দিনে ঠেকেছে। আগে মেলাটি বোঁথড় গ্রাম ছাপিয়ে নদীর এপারে শহরে এসে ঠেকতে। মেলার লোক সমাগমের গমগম শব্দ ৫ কিমি দূর থেকেও শোনা যেতো। চাঁপাইনব্বাবগঞ্জ, দিনাজপুর, ঢাকা এমনকি ভারত থেকে রকমারী পন্যসামগ্রী নিয়ে দোকানদার আসতো মেলায়। নাগরদোলা, ঘোড়াদোলা, বায়োস্কোপ, যাত্রা, পুতুলনাচ, সার্কাস আসতো। এখন আর আসেনা। প্রবহমান বাংলায় মেলার সাথে লোক ঐতিহ্যের যে একটা মেলবন্ধন ছিলো, সেটা ধূসর হয়ে গেছে। এখন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বেগবান হয়েছে। চড়ক মেলাটির মিথ সম্পর্কে জানতে চাইলে বোঁথড় গ্রামের বৃদ্ধ চৈতন্য সরকার বলেন, শুনেছি ৭ শ’ বছর আগের থেকে এখানে চড়ক মেলা চলছে। প্রথম চড়কগাছ প্রতিস্থাপন করেছিলেন মাখন ষ্যানাল নামের এক কাঠ ব্যবসায়ী। আসাম থেকে কিনে আনা তার কাঠের মধ্যে চড়ক গাছের আগমন ঘটেছিলো এখানে। আর মাখনের স্ত্রীকে স্বপ্নের মাধ্যমে দেবতা মহাদেব জানিয়ে দেন চড়ক হয়ে তিনি এসেছেন। তাকে স্থাপন করে যেন পূজা দেওয়া হয়। সেই থেকে স্যানাল আর আচার্য্য পরিবার পূজা শুরু করেন হলদার আর সূত্রধরদের নিয়ে। আচার্য্য পরিবারের ছেলে বিপ্লব আচার্য্য জানান, এখনকার ৩ দিনের উৎসবের মধ্যে রয়েছে- ১৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার চড়কগাছ পানি থেকে তোলা। ভক্ত অনুসারীরা তাদের মনবাসনা পূরনের আশায় চড়ক গাছে তেল দুধচিনি মাখবে। ভরন চালান দেওয়া. ভরন নাচ, কালীনাচ সহ আনুসাঙ্গিক পূজা-অর্চনা। রাতে ফুলভাঙ্গা, হাজরা ছাড়া। পরের দিন ১৪ এপ্রিল চৈত্র সংক্রান্তির তিথিতে চড়ক গাছ ঘোরানো। আর এই দিনটাই বেশী জাকজমকপূর্ন হয়। লোক সমাগম হয় প্রচুর। ১৫ এপ্রিল অর্থাৎ লোকনাথ পঞ্জিকা অনুসারে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হবে। উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সম্পাদক অশোক চক্রবর্তী জানালেন, প্রতিবারের মতো এবারও শান্তিপূর্ন ভাবে চড়ক মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

%d bloggers like this: