কুরবানি: আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত

0

মাওলানা মাসউদুর রহমান:

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের জন্য যে সকল বিধিবিধান দিয়েছেন কুরবানি তার মধ্যে অন্যতম৷ কুরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’য়ালার সান্নিধ্য অর্জিত হয় ৷ প্রলুব্ধ আত্মার চাহিদাকে দমিয়ে মহান মুনিবের সন্তুষ্টি অর্জনের এক অগ্নিপরীক্ষা৷

যে পরীক্ষায় অত্যন্ত সফলভাবে উত্তির্ণ হয়েছিলেন সায়্যিদুনা হযরত ইবরাহিম খলীলুল্লাহ (আঃ) ৷ পিতা-পুত্রের আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক সে ঘটনা আজও ইতিহাসের পাতায় চির ভাস্বর ৷ আল্লাহপ্রেমিক বান্দাদের জন্য যা তেজোদ্বীপ্ত ঈমানের চেতনা হয়ে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত ৷

কুরবানির পটভূমি

কুরবানি আমাদের জন্য নতুন কোন বিধান নয়, পৃথিবীর সুচনালগ্ন তথা আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এর যুগ থেকেই কুরবানির প্রবর্তন হয়েছে ৷ তার পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের মধ্যে আপন বোনের বিবাহকে কেন্দ্র করে যে দন্দ তৈরী হয়েছিল তার নিরসন কল্পে আল্লাহ তা’য়ালা উভয় ভাইকে কুরবানির নির্দেশ দিয়েছিলেন৷

কুরআনের বর্ণনায় সেই ঘটনা

আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কিছু উৎসর্গ নিবেদন করেছিল, তখন তাদের একজনের উৎসর্গ গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের গৃহীত হয়নি। সে বললঃ আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। সে বললঃ আল্লাহ ধর্মভীরুদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন।

যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হস্ত প্রসারিত করব না। কেননা, আমি বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, আমার পাপ ও তোমার পাপ তুমি নিজের মাথায় চাপিয়ে নাও। অতঃপর তুমি দোযখীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাও। এটাই অত্যাচারীদের শাস্তি। অতঃপর তার অন্তর তাকে ভ্রাতৃহত্যায় উদুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল৷
সূরা মায়েদা আয়াত,২৮-৩০

কুরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মুসলিম মিল্লাতের পিতা সায়্যিদুনা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর বয়স যখন মতান্তরে ৯০ বা ১০০ বা ১২০ বছর তখন বিবি হাজেরার গর্ভে পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলো। তার নাম রাখা হয় ইসমাঈল। এই পুত্রকে নিয়ে কিছুদিন পর কঠিন পরীক্ষায় উপনীত হলেন পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)।

কুরআনের বর্ণনায় সংক্ষিপ্ত ইতিহাস- হে আমার পরওয়ারদেগার ! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর। সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম।অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতাঃ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন।

যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল। তখন আমি তাকে ডেকে বললামঃ হে ইব্রাহীম ! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে ! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু। সূরা সাফ্ফাত আয়াত,৯৯-১০৭

কোন কোন রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, এই স্বপ্ন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে উপর্যুপরি তিন দিন দেখানো হয়, তবে এ কথা সত্য যে, পয়গাম্বরের স্বপ্নও ওহি”।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- ইবরাহিম ! তুমি কুরবানি কর। সকালে উঠে তিনি হৃষ্টচিত্তে একশত উট কুরবানি করলেন, কিন্তু পরবর্তী রাতেও তিনি একই নির্দেশ প্রাপ্ত হলেন, আবার তিনি পরের দিন সকালে একশত উট কুরবানি করলেন। তৃতীয় রাত্রে আবার একই স্বপ্ন দেখলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ইবরাহিম ! তুমি কুরবানি কর। তিনি আরজ করলেন, মা’বুদ ! আমি কি কুরবানি করবো ? ইরশাদ হলো- তোমার সর্বাপেক্ষা প্রিয় জিনিসটি আমার রাস্তায় উৎসর্গ কর।

অন্য রেওয়ায়েতে নামসহ বলা হয়েছে, এটি জিলহজ মাসের দশ তারিখ রাতের কথা। আগামী দিনই হচ্ছে কুরবানির দিন। সুতরাং তার নিকট পরিষ্কার হয়ে গেল যে, আজ আদরের ছেলে ইসমাঈলকে কুরবানি দিতে হবে। অতপর তিনি কুরবানির সংকল্প হাজেরা (আ.) কে অবহিত করলেন এবং বললেন, তাকে নতুন কাপড়-চোপড় পরিয়ে দাও। বিবি হাজেরা (আ.) তার কলিজার টুকরা পুত্রকে গোসল করিয়ে উত্তম পরিচ্ছেদে আচ্ছাদিত করলেন এবং প্রাণ ভরে চির জীবনের মত বুকে জড়িয়ে আদর সোহাগ করে বললেন, যাও আমার পুত্র ! আল্লাহর জন্য নিজেকে উৎসর্গ কর। সে দিনটি ছিল কুরবানির দিন।

যে সময়ে কিরণ হেজাজের উপত্যকাগুলোতে প্রতিফলিত হয়ে চিকচিক করছে। এমতাবস্থায় ইবরাাহিম (আ.) বললেন, ইসমাইল ! ছুরি ও রশি নিয়ে জঙ্গলে আস। রান্না-বান্নার জন্য কাঠ কেটে নিয়ে আসি, ইসমাইল (আ.) আব্বার আদেশ পেয়ে দৌঁড়ে লম্বা রশি ও তীক্ষ্ণ ছুরি নিয়ে জঙ্গল অভিমুখে চললেন।

প্রথমেই ইবরাাহিম (আ.) ইসমাঈলকে স্বপ্নের কথা অবগত করে তার থেকে জবেহের পরামর্শ চাইলেন। বললেন অতএব তুুমি ভেবে দেখ তোমার অভিমত কি ? কিন্তু সে পুত্র ছিলেন খলিলুল্লারই পুত্র। ইসমাঈল বলে ওঠলেন, আল্লাহ আপনাকে যে হুকুম করেছেন, তা পালন করুন।

এ মহান কাজে মতামতের কি প্রয়োজন ? আব্বাজান ! আমার থেকে বড় সৌভাগ্যবান কে আছে যে, আপন পিতার জবেহের মাধ্যমে আমি মহান আল্লাহর সাথে মিলিত হতে পারবো। আর বিলম্ব নয়, এখনই বিসমিল্লাহ বলে আমার গলায় ছুরি চালিয়ে দেন, যাতে ইবলিস আমাদের এই খালেস নিয়তকে নষ্ট করার সুযোগ না পায়। তবে আব্বাজান ! ইহ জগৎ থেকে চিরবিদায় নেওয়ার পূর্ব মুহূর্তে আপনি আমার এই প্রার্থনাগুলো মনজুর করুন।

১. আপনি ছুরি খুব ধারালো করে নিন। আর আমার হাত পা শক্ত করে বেঁধে ফেলুন। যেন আমার অনিচ্ছাকৃত লাফা-লাফিতে আমার রক্তের ছিটা আপনার কাপড়কে নাপাক না করে।
২. আমাকে মাটির দিকে মুখ করিয়ে শোয়ায়ে দিন, যেন জবেহ করার সময় আমার চেহারা আপনি না দেখেন, যা জবেহ থেকে বাধা দিবে।

৩. আমার রক্ত মিশ্রিত জামা কাপড় নিয়ে আম্মাজানকে দিবেন। তাহলে আমার আম্মা পুত্রের বিচ্ছেদের যন্ত্রণা লাঘব করতে পারবেন। এক রেওয়ায়েতে আছে যে, ইসমাঈল (আ.) জবেহ করার খবর তার আম্মাকে না দিতে বলেছিলেন। হযরত ইবরাাহিম (আ.) স্বীয় সন্তানের মুখে একথা শুনে আনন্দে অধীর হয়ে ওঠেন এবং আদরের টুকরা সন্তানকে ঐ পাথরের নিকট নিয়ে গেলেন, যেখানে হজের মৌসুমে কুরবানির পশুগুলো মিনা নামক স্থানে নিয়ে জবেহ করা হয়। অতপর হযরত ইসমাঈল (আ.) বললেন, “ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন”।

হযরত ইবরাাহিম (আ.) ছুরিতে পাথরের শান দিতে লাগলেন। এদিকে উর্ধ্ব জগতের ফেরেশতাকুলের মাঝে পড়ে গেল হাহাকার। এমন একটি দৃশ্যের অবতারনা হচ্ছে, যার দ্বিতীয় কোন উপমা নেই, ছুরি ধার দেওয়া হয়ে গেছে। ইবরাহিম (আ.) কুরবানির জন্তুর মত নিজের পুত্রকে উপুড় করে শোয়ায়ে দিলেন। অদৃশ্য জগতে পড়ে গেল ক্রন্দনের রোল, কিন্তু কারো জানার ক্ষমতা নেই, মহান আল্লাহ কোন উদ্দেশ্যে আপন খলিলের মাধ্যমে এরূপ হৃদয় বিদায়ক ঘটনা ঘটাচ্ছেন। আল্লাহই তো ভালো জানেন।

তারপর তড়িৎ-গতিতে বিসমিল্লাহ বলে তীক্ষ্ণ ছুরি বের করে নিলেন এবং পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়ে দিলেন, আর ঐ দিকে আল্লাহর হুকুমে জিবরাঈল (আ.) নিজের অজান্তেই চিৎকার করে আল্লাহু আকবর বলে উঠলেন ৷

এ মর্মান্তিক দৃশ্যে উর্ধ্ব জগতের ফেরেশতাজগত, সুবিশাল মহাশূন্য, ধরণীর নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, পশু পাখি, তরুলতা সবকিছুর মধ্যে প্রকম্পন আরম্ভ হয়েছিল। সৃষ্টি জগৎ রুদ্ধশ্বাসে প্রত্যক্ষ করেছিল আত্মোৎসর্গের এ বিরল ঘটনাটি। ফেরেশতারা প্রার্থনা করেছিল- হে প্রভু কেন তুমি এ হুকুম প্রদান করেছ? মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ উত্তরে বলেন, আমার কিছু সংখ্যক ফেরেশতারা উক্তি করেছিলো, হে প্রভু আপনি ইবরাহিম (আ.)-কে কেন খলিলরূপে আখ্যায়িত করলেন ?

আমি বলেছিলাম তিনি আমার প্রকৃত খলিল এবং আমার জন্য তার বন্ধুত্ব কতটুকু তা পরীক্ষা করে নিলাম। দৃঢ়চিত্তে ইবরাহিম (আ.) সন্তানের গলায় ছুরি চালালেন, এদিকে আল্লাহ তাআলার রহমতের জোশ এসে গেল। তিনি ছুরিকে লক্ষ্য করে হুকুম করলেন খবরদার ইসমাইলের একটি পশমও যেন না কাটে। আল্লাহর হুকুমে ছুরির কাজে পর্দা পড়ে গেল।

এতে ইবরাহিম (আ.) রাগান্বিত হয়ে ছুুরি দূরে নিক্ষেপ করলেন। ছুরি একটি পাথরে পড়ে পাথর দুই টুকরা হয়ে গেল। সুবহানাল্লাহ ! অতপর মহান আল্লাহ জিবরাাঈল (আ.)-কে হুকুম দিলেন, হে জিবরাঈল ! তুমি বেহেশত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে যাও এবং আমার খলিলকে সালাম দিয়ে ইসমাঈলের পরিবর্তে এটাকে কুরবানি করতে বল।

আমি তার কুরবানি কবুল করেছি। ইসমাঈলের গলা কাটা আমার উদ্দেশ্য নয়; বরং তোমাকে পরীক্ষা করা আমার উদ্দেশ্য ছিল। আল্লাহ পাক বলেন- আমি ইবরাহিমকে যে ফিদিয়া দিয়েছি তা এক শ্রেষ্ঠ কুরবানি। মুফাসসিরগণ লিখেছেন- ইহা সেই দুম্বা যা আদম (আ.)-এর ছেলে হাবিলের কুরবানির দুম্বা ছিল এবং ইহা জান্নাতে খেয়ে দেয়ে মোটা তাজা হয়ে সংরক্ষিত ছিল। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন)

কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ >

কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্ত মোট ছয়টি-
১. কুরবানী দাতা মুসলমান হওয়া, সুতরাং অমুসলিমের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।
২. কুরবানী দাতা স্বাধীন হওয়া, সুতরাং দাস-দাসীর উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।
৩. কুরবানী দাতা মুকীম বা নিজ শহরের বাসিন্দা হওয়া, সুতরাং মুসাফিরের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।
৪. কুরবানী দাতা নেসাবের মালিক হওয়া, সুতরাং গরীবের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।
৫. বালেগ বা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া, সুতরাং নাবালেগের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।
৬. আকেল বা বোধশক্তি সম্পন্ন হওয়া, সুতরাং নির্বোধ ও পাগলের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।

নেসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এসবের মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়, বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন ঋণ ও প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে নেসাব পকিমাণ থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে ।

সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বাজারে বিক্রয় করতে গেলে যে দাম পড়বে, তার ভিত্তিতেই নেসাব হিসাব করতে হবে। বর্তমানে গ্রাহকদের থেকে দোকানদারদের ক্রয়মূল্য প্রতি ভরি ৫০০ টাকা হিসেবে সাড়ে ৫২ ভরির দাম আসে 500×52.50=26,250 (ছাব্বিশ হাজার দুইশত পঞ্চাশ টাকা)। অর্থাৎ এই পরিমাণ টাকা কারো জিলহজ্বের ১০,১১ ও ১২ তারিখের মাঝে থাকলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব।

এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে সাদক্বায়ে ফিতর ও কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে নিসাবের বিধান একইরকম অর্থাৎ স্বর্ণ-রূপা , টাকা-পয়সা ও ব্যবসার মাল ছাড়াও কারো যদি অতিরিক্ত জায়গা-জমি ও ঘরের আসবাবপত্র কিংবা অতিরিক্ত অন্য সরঞ্জামাদী থাকে যার মূল্য সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপা সমপরিমাণ হয় তাহলে তার উপরেও কুরবানি ওয়াজিব ৷

যাকাতের ক্ষেত্রে স্হাবর সম্পত্তি ও ব্যবহার্য অতিরিক্ত আসবাবপত্র নিসাবের হিসাবে গন্য হয়না, কিন্তু সাদক্বায়ে ফিতর ও কুরবানির ক্ষেত্রে এগুলো অবশ্যই নিসাবের হিসাবে গন্য হবে ৷ উল্লিখিত দিকগুলোর বিবেচনায় সমাজের সিংহভাগ মানুষের উপর কুরবানি ওয়াজিব ৷

কুরবানির কতিপয় জরুরী মাসায়েল >

★ বিসমিল্লাহর বিধান : ভুলক্রমে ‘বিসমিল্লাহ’ না পড়লে পশু হারাম হবে না , কিন্তু ইচ্ছাকৃত ‘বিসমিল্লাহ’ ছেড়েদিলে পশু হারাম হয়ে যাবে ৷ কুরবানির পশু কুরবানিদাতার জবেহ পদ্ধতি জানা থাকলে নিজেই জবেহ করা উত্তম ৷

★ যে সকল পশু দ্বারা কুরবানি করা জায়েয : উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, ও দুম্বা দ্বারা কুরবানি করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য হালাল পশু যেমন, হরিণ, বন্যগরু, ঘোড়া ইত্যাদি দ্বারা কুরবানি করা জায়েয নয় ৷

★ কুরবানির পশুর বয়সসীমা : উট কমপক্ষে পাঁচ বছরের হতে হবে, গরু ও মহিষ ন্যূনতম দুই বছর, আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি এমন মোটাতাজা হয় যে, দেখতে একবছরের মতো মনে হয়,তাহলে এর দ্বারাও কুরবানি করা বৈধ হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে ছয়মাস বয়সের হতে হবে। উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স একবছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানি জায়েয হবে না।

★ পশুর মধ্যে যেসব ত্রুটি থাকলে কুরবানী দেয়া যাবে না : (১) যে পশুর দৃষ্টিশক্তি নেই। (২) যে পশুর শ্রবণশক্তি নেই। (৩) এই পরিমাণ লেংড়া যে, জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না। (৪) লেজের অধিকাংশ কাটা। (৫) কানের অধিকাংশ কাটা। (৬) অত্যন্ত দুর্বল, জীর্ণ-শীর্ণ প্রাণী। (৭) গোড়াসহ শিং উপড়ে গেছে। (৮) পশু এমন পাগল যে, ঘাস পানি ঠিকমত খায় না। মাঠেও ঠিকমত চরানো যায় না। (৯) জন্মগতভাবে কান নেই। (১০) দাঁত মোটেই নেই বা অধিকাংশ নেই। (১১) স্তনের প্রথমাংশ কাটা। (১২) রোগের কারণে স্তনের দুধ শুকিয়ে গেছে। (১৩) ছাগলের দুটি দুধের যে কোন একটি কাটা। (১৪) গরু বা মহিষের চারটি দুধের যেকোন দুটি কাটা। (১৫) জন্মগতভাবে একটি কান নেই।

★ পশুর মধ্যে যেসব ত্রুটি থাকলে কুরবানী দেয়া যাবে : (১) পশু পাগল, তবে ঘাস-পানি ঠিকমত খায়। (২) লেজ বা কানের কিছু অংশ কাটা, তবে অধিকাংশ আছে। (৩) জন্মগতভাবে শিং নেই। (৪) শিং আছে, তবে ভাংগা। (৫) কান আছে, তবে ছোট। (৬) পশুর একটি পা ভাংগা, তবে তিন পা দিয়ে সে চলতে পারে। (৭) পশুর গায়ে চর্মরোগ। (৮) কিছু দাঁত নেই, তবে অধিকাংশ আছে। (৯) স্বভাবগত এক অন্ডকোষ বিশিষ্ট পশু। (১০) পশু বয়োবৃদ্ধ হওয়ার কারণে বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম। (১১) পুরুষাঙ্গ কেটে যাওয়ার কারণে সঙ্গমে অক্ষম। ( তবে উত্তম হচ্ছে ত্রুটিহীন পরিপূর্ণ সুস্থ পশু কুরবানি দেয়া )

★ ভালো পশু ক্রয়ের পর ত্রুটিযুক্ত হয়ে গেলে : কুরবানীর উদ্দেশ্যে ভাল পশু ক্রয়ের পর যদি তা এই পরিমাণ ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়, যা দ্বারা কুরবানী জায়েজ হবে না তাহলে দেখতে হবে ক্রেতা ধনী না দরিদ্র? ক্রেতা যদি দরিদ্র হয় তাহলে সেই ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়েই সে কুরবানী দিবে। আর যদি ক্রেতা ধনী হয়, তাহলে দ্বিতীয় আরেকটি পশু কিনে কুরবানী দিতে হবে। প্রথমটি দিয়ে কুরবানী শুদ্ধ হবে না।

★ কুরবানির পশুতে শরিকানার বিধান : একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একটাই কুরবানি দিতে পারবে। এই প্রাণীগুলো থেকে কয়েকজনে মিলে একটি কুরবানি করলে কারো কুরবানি সহিহ হবে না। আর উট, গরু বা মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারবে। সাতের অধিক শরিক হলে কারো কুরবানি সহিহ হবে না।

★ শরিকদের মাঝে কুরবানিকৃত পশুর গোশত বন্টনের বিধান : সাতজন মিলে কুরবানি করলে সবার অংশ বরাবর হতে হবে । কারো অংশে এক সপ্তমাংশের চেয়ে কম হতে পারবে না। যেমন, কারো আধাভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরিকের কুরবানি সহিহ হবে না।

সতর্কতা : এ ক্ষেত্রে কারো ভাগে যদি পায়া, ক্ষুর, মাথা বা কোন হাড্ডি বেশি যায়, বা শরিকদের কেউ পশুর বিশেষ কোনো অংশ নিতে চায়, তাহলে তার অংশ থেকে গোশত একটু কমিয়ে দিতে হবে। যেন গড়ে সমান হয়। কুরবানী যেহেতু আল্লাহর জন্য করা হয়, তাই এতে নিজে ভোগ করার চেয়ে গরীব মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা বেশি করা উচিত। কুরবানীর গোশত নিজে খাবে, অন্যকে খাওয়াবে, যতদিন ইচ্ছা রেখে খাওয়া যায়, এতে কোন বাধা নেই। পশুর রশি ও গলার মালা ইত্যাদি দান করে দিতে হবে।

★ কুরবানীর পশুর গোশতের বিধান : কুরবানীর পশুর গোশত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ গরীব মানুষকে, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে দেয়া মুস্তাহাব । (অবশ্য বিশেষ প্রয়োজন থাকলে সম্পূর্ণ গোশত নিজের জন্য রেখে দিতে পারবে, তবে যথা সাধ্য গরীব-মিসকিনকে বঞ্চিত করবেনা) আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী গোশত নিতে আসবে এই অপেক্ষা না করে নিজ দায়িত্বে তাদের ঘরে গোশত পৌঁছে দেয়া উচিত।

★ যদি একাধিক শরীক থাকে তাহলে গোশত ওযন করে ভাগ করবে,অনুমান বা আন্দাজ করে নয়। কারণ অনুমান করে ভাগ করলে বেশ-কম হতে পারে, যা গুণাহের কারণ। যে কসাই গোশত তৈরি করে দিবে তাকে আলাদাভাবে কাজের জন্য মজুরি দিতে হবে। মজুরি হিসেবে কোরবানীর গোশত দেয়া জায়েজ নেই। তার প্রাপ্য মজুরি দেয়ার পর লিল্লাহ গোশত আলাদা দিবে।

★ চামড়া সংক্রান্ত বিধান : (১) কুরবানীর পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারবে। (২) গোশতের মতো অন্যকে উপহারও দিতে পারবে। (৩) উত্তম হচ্ছে পশুর চামড়া কোন মাদরাসার লিল্লাহ ফান্ডে দান করে দেয়া,যাতে এটা বিক্রি করে মাদরাসার গরীব-ইয়াতিম ছাত্রদের খরচ যোগান দেয়া যায়। উল্লেখ্য, বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু হলো মাদরাসা। তাই মাদরাসায় আর্থিক সহায়তা করা সব মুসলমানের দায়িত্ব। কুরবানীর পশুর চামড়া দানের মাধ্যমে আমরা সেই দায়িত্ব পালন করতে পারি।

(৪) চামড়া যদি বিক্রি করা হয় তাহলে তার মূল্য অবশ্যই গরীব মানুষের মধ্যে দান করে দিতে হবে। নিজে ব্যবহার করা যাবে না। (৫) চেষ্টা করা উচিত চামড়ার টাকা পরিবর্তন না করে হুবহু দান করে দিতে। (৬) চামড়া সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির চেয়ে কোনো মাদরাসা কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রি করা উত্তম। কারণ তারা এ থেকে উপার্জিত সম্পূর্ণ অর্থ ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করবে।

★ জীবিত বা মৃতের নামে কুরবানি : কাহারো পক্ষ থেকে জীবিত বা মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানি দেয়া জায়েয আছে ৷ এ ক্ষেত্রে কোন মৃত ব্যক্তি যদি মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে যায়, তাহলে তার নামে কুরবানিকৃত পশুর গোশত ও চামড়া সম্পুর্ণ সাদক্বা করে দিতে হবে ৷ আর যদি ওসিয়ত না করে যায় তাহলে তার নামে কুরবানিকৃত পশুর গোশতের বিধান স্বাভাবিক কুরবানির মতই ৷

★ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কুরবানির বিধান : কোনো ব্যক্তির জন্য যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে কুরবানি ওয়াজিব বা আবশ্যক, সে ব্যক্তি যদি ঋণগ্রস্ত হয় তবে তার কুরবানি দেয়া আবশ্যক কিনা তা নির্ভর করবে ওই ব্যক্তির অবস্থার ওপর। আর তা হলো-

নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক যদি ঋণগ্রস্ত হয় তবে দেখতে হবে- ঋণের পরিমাণ কত? কেননা ঋণ পরিশোধ করে দিলে যে সম্পদ থাকবে, তা কি নেসাব পরিমাণ হবে? যদি ঋণ পরিশোধ করে দিলে কুরবানির সময়ে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তবে ওই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য কুরবানি আবশ্যক নয় । আর যদি ঋণ পরিশোধ করে দিলেও কুরবানির সময়ে সাময়িক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে ওই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্যও কুরবানি আবশ্যক।

★ কুরবানীর সাথে আকিকার বিধান : কুরবানীর সাথে আকিকা দেয়া যায়,এতে কোন সমস্যা নেই। কুরবানীর গোশতের মতো আকিকার গোশতও নিজে খেতে পারবে, অপরকে খাওয়াতে পারবে, দিতেও পারবে। ছেলের আকিকা হলে দুইটি ছাগল অথবা গরুতে দুই শরীক এবং মেয়ের আকিকা হলে একটি ছাগল অথবা গরুতে এক শরীক দিতে হবে।

যেমন একটি হাদীসে এসেছে, বিখ্যাত সাহাবী হযরত আমর ইবনে শোয়াইব (রা.) বলেন, প্রিয় নবী (সা.) বলেন, যার সন্তান হয় সে যদি চায় আকিকা দিতে, তাহলে ছেলে সন্তান হলে দুটি ছাগল এবং মেয়ে সন্তান হলে একটি ছাগল আকিকা দিবে। আবু দাউদ, নাসায়ী।

প্রিয় পাঠক! এখানে একটি ভুল ধারণার অবসান হওয়া উচিত। কেউ মনে করতে পারে, এখানে মেয়ে সন্তান হলে মাত্র একটি ছাগল দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আর ছেলে হলে দুটি। এতে করে ছেলেদের মর্যাদা বেশি দেয়া হয়েছে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

এ ক্ষেত্রে কোনভাবেই ছেলের মর্যাদা বেশি দেয়া হয়নি। কারণ, আকিকা দেয়া হয় সন্তানের উপর থেকে বিপদ আপদ যেন দূর হয়ে যায় এই উদ্দেশ্যে। সাধারণত ছেলে সন্তানের উপর বিপদ আপদ বেশি আসে এবং মেয়ে সন্তানের উপর কম আসে। তাই আল্লাহর রাসূল (সা.) ছেলের জন্য দুই এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল আকিকা দিতে বলেছেন।

এখানে আরেকটি বিষয় জানা জরুরি। তা এই যে, যদি কারো ছেলে সন্তান হয় এবং তার দুটি ছাগল আকিকা দেয়ার সামর্থ না থাকে তাহলে একটি ছাগল দিলেই হবে। অনুরূপভাবে গরু-মহিষে দুই শরীক দিতে সক্ষম না হলে এক শরীক দিলেও চলবে।

বর্তমান পরিস্হিতিতে বিশেষ মাসয়ালা

বর্তমান পরিস্হিতিতে অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকট থাকায়, অনেকে কুরবানি না করে তার অর্থ গরীব-মিসকিন বা অর্থনৈতিক সংকটে থাকা মানুষদেরকে দান করে তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা করতে চায়৷

এ ক্ষেত্রে ফতোয়া হল শরীয়ত সমর্থিত যে সকল প্রতিবন্ধকতার কারনে কুরবানি করতে না পারলে করবানির অর্থ গরীব-মিসমিনকে দান করে দিতে হয়, বর্তমান পরিস্হিতি সে সকল প্রতিবন্ধকতার আওতায় পড়েনা, বিধায় বর্তমানে কুরবানিই করতে হবে, কুরবানির অর্থ দান করার কোন সুযোগ নেই৷

সতর্কতা

কুরবানি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, যার ভিত্তি হলো সম্পূর্ণ ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের উপর, এ ক্ষেত্রে কোনো কুরবানিদাতার যদি আল্লাহর সন্তষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যের লেশমাত্র থাকে, তাহলে তার কুরবানি আল্লাহর দরবারে কবূল হবেনা ৷ অতএব পশু ক্রয়ের পুর্বেই কুরবানিদাতার মনের নিয়ত পরিশুদ্ধ করা অপরিহার্য কর্তব্য ৷

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে তার সন্তষ্টি অর্জনের জন্যই একমাত্র কুরবানি করার তাওফীক দান করুন এবং তার খলীল হযরত ইবরাহিম (আঃ) ও তার হাবীব হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মত আমাদের কুরবানি কবূল করুন, আমিন

%d bloggers like this: