আদালতকে অগ্রাহ্য করলেন শওকত, এজলাসে তার আইনজীবীদের অসদাচরণ

0

নিজস্ব প্রতিবেদক,

ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সের (ইউআইটিএস) উপাচার্যকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দাবির মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে যাননি বাংলাদেশ জাতীয় বঙ্গলীগের প্রেসিডেন্ট শওকত হাসান। উল্টো তার আইনজীবীদের আদালতে অসদাচরণ করার অভিযোগ উঠেছে।

চাঁদাবাজির ওই মামলায় ভুয়া ও জাল মেডিকেল সনদ দেখিয়ে গত ১২ আগস্ট জামিন পান বঙ্গলীগ প্রেসিডেন্ট। ঘটনা জানাজানি হলে ২৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম কোর্টের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর রহমান আসামি ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ২৭ আগস্ট সকাল ১০টায় আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আদালতের সেই নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে হাজির হননি শওকত। উল্টো দুপুরে তার আইনজীবীরা আদালতের ভেতরে অসদাচরণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আদালত সূত্র জানায়, গতকাল বিচারকের এজলাসে শুনানির সময় শওকতের আইনজীবীরা ঢুকে পড়েন বিচারকের খাসকামরায়। আসামির আইনজীবীদের অসদাচরণের কারণে শুনানির আদেশ দিতে বিব্রতবোধ করেন আদালত। বিষয়টি পরবর্তীতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুলফিকার হায়াতের দপ্তর পর্যন্তও পৌঁছায়। বাদীপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শুনে খাসকামরায় অনাকাঙিক্ষত ঘটনার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া ছাড়াও আসামির জামিন বাতিলের আবেদনের অধিকতর শুনানির দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

ইউআইটিএস’র পক্ষের আইনজীবী আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া বলেন, ইউআইটিএস’র উপাচার্যকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ৬০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি রাজধানীর ভাটারা থানায় শওকত হাসান মিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। মামলাটি করেন প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী মো. মোস্তফা কামাল। মামলাটিতে গত ৮ জানুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন নেন শওকত।

এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ মিলছিল না। জামিনের মেয়াদ শেষ হলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে অমান্য করে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। পাঁচ মাস পর গত ২৭ জুলাই ঢাকার সিএমএম আদালতে শওকত হাসান মিয়া গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আত্মসমর্পণপূর্বক জামিনের আবেদন করেন। অসুস্থতার সমর্থনে কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে না পারায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বাকী বিল্লাহ জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠান।

আইনজীবী আব্দুল মান্নান আরও বলেন, গত ১২ আগস্ট শওকত হাসানের আইনজীবীর মাধ্যমে ঢাকার পশ্চিম রামপুরার ডেলটা স্পেশালাইজড হসপিটালের প্যাডে দেওয়া একাধিক ‘চিকিৎসা সনদ’ ব্যবহার করে আদালতে জামিন আবেদন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাসুমুর রহমান মজুমদার ও এম এম গাফফার চোধুরী ইমন। প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনা করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শারাফুজ্জামান আনসারীর আদালত ওইদিনই শওকতকে জামিন দেন।

কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, আদালতকে যে চিকিৎসা সনদপত্র দেখিয়ে শওকত মিয়া জামিন নিয়েছেন তার পুরোটাই ছিলো জাল ও ভুয়া। বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকও (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) তদন্ত সাপেক্ষে ১৮ আগস্ট লিখিতভাবে জানান, আসামি শওকত হাসান মিয়ার পক্ষে আদালতে দাখিলকৃত মেডিকেল সার্টিফিকেটটি জাল। পরে ঢাকার সিএমএম আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাফুজ্জামান আনছারী কর্তৃক আসামির অনুকূলে ১২ আগস্ট প্রদত্ত শওকত হাসান মিয়ার জামিন আদেশটি বাতিল ও জামিন সংশ্লিষ্ট জাল জালিয়াতির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য গত ২০ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের কাছে আবেদন করেন।

আবেদনের প্রেক্ষিতে ২৩ আগস্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর রহমান আসামির জামিন কেন বাতিল হবে না এবং আসামির উপস্থিতি নিশ্চিতকল্পে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। পাশাপাশি লিখিত বক্তব্যসহ আসামির উপস্থিতি সাপেক্ষে ২৭ আগস্ট (গতকাল) সকাল ১০টায় আদালত উপস্থিত থাকার জন্য আসামির আইনজীবীকে নির্দেশ দেন। একইদিন একই সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকেও হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।

আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে সিএমএম কোর্টের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর রহমানের আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবী নজিবুল্লাহ হিরু ও গাজী শাহ্ আলমের নেতৃত্বে প্রায় দুই শতাধিক আইনজীবী আসামির জামিন বাতিলের আবেদনের উপর শুনানি করেন। কিন্তু আসামি শওকত হাসান ছাড়াই তার আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেন। আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে পরে আদেশ দেবেন মর্মে উভয়পক্ষকে জানান। বিচারকের এজলাসে বাদী পক্ষের আইনজীবীরা আদেশের আপেক্ষায় ছিলেন।

এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাসুমুর রহমান মজুমদার ও এমএ গাফফার চৌধুরী ইমন বিচারকের খাস কামরায় অবস্থান করেছেন বলে আদালত জানতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে আদালত বাদীপক্ষের ঢাকা বারের সিনিয়র আইনজীবীরাসহ অন্যান্য আইনজীবীর সামনেই খাসকামরা থেকে আদালতের সামনে হাজির হওয়ার জন্য আসামির দুই আইনজীবীকে ডেকে পাঠান। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিচারকের খাসকামরা থেকে আদালতের সামনে আসেন এবং মাথা নিচু করে বেরিয়ে যান।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে হাকিম এই মামলার আদেশ প্রদানে বিব্রতবোধ করেন এবং বাদীপক্ষের আইনজীবীদের এই বিষয়ে প্রতিকারের জন্য সিএমএমের কাছে সাক্ষাৎ করার জন্য নির্দেশনা দেন। এই নির্দেশনা পেয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি গাজী মো. শাহ আলমসহ সিনিয়র আইনজীবীরা জুলফিকার হায়াতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শুনে আদালত অনাকাঙিক্ষত ঘটনার বিষয়টি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আশ্বাস প্রদান করেন এবং আসামির জামিন বাতিলের আবেদনের অধিকতর শুনানির জন্যে সত্তর ব্যবস্থা নেবেন মর্মে আশ্বস্ত করেন।

অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাসুমুর রহমান মজুমদার বলেন, আদালত চলাকালীন বিচারকের খাস কামরায় কোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনাই ঘটেনি। এটা স্রেফ অপপ্রচার; বরং গতকাল আদালতে তিনি-ই হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন।

ইউআইটিএস’র পক্ষে আইনজীবী মান্নান ভূঁইয়া জানান, সেনাবাহিনীর কোর্ট মার্শালের বিচারে চাকরিচ্যুত সিপাহী হয়েও অবসরপ্রাপ্ত মেজর পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন প্রতারণা করে আসছেন বঙ্গলীগের প্রেসিডেন্ট শওকত হাসান মিয়া। যার তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তিনি কেবল এই ৬০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি মামলারই আসামি নন। তার বিরুদ্ধে সমাজসেবায় একুশে পদকপ্রাপ্ত ও ইউআইটিএস’র বোর্ড অব ট্রাস্টিজ এবং পিএইচপি ফ্যামিলি’র চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে ৫৭ কোটি টাকা দাবির অভিযোগও রয়েছে।

ওই জাল-জালিয়াতির মামলায় শওকত হাসানের বিরুদ্ধে গত বুধবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। ঢাকার সিএমএম আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. তোফাজ্জল হোসেন ওই মামলার আসামি শওকতের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর তদন্ত প্রতিবেদন (অভিযোগ পত্র) আমলে নিয়ে এই পরোয়ানা জারি করেন।

এছাড়াও গুলশান থানা পুলিশ গত ২৩ ডিসেম্বর ইউআইটিএস-এর উপাচার্য ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনেককে হত্যার হুমকি দেয়ায় শওকত হাসান মিয়া ও তার সশস্ত্র ক্যাডারদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৫০৬ ধারায় তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন আকারে ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি প্রসিকিউশন দাখিল করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন। শওকত হাসান মিয়া তার নিজ জেলা জামালপুর ও ঢাকায় বহু অপকর্ম করার কারণে সংক্ষুব্ধদের আবেদনের প্রেক্ষিতে দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) তার বরাবর নোটিশ দিয়েছেন বলেও আইনজীবী মান্নান।

উল্লেখ্য, নতুন ধারার রাজনীতি শুরুর ঘোষণা দিয়ে ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ জাতীয় বঙ্গলীগ’ নামে দল গঠন করেন মো. শওকত হাসান মিয়া। নিজে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তেমন না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচার করতে দেখে গেছে বঙ্গলীগের পক্ষ থেকে।

এখন শওকত হাসানের বিরুদ্ধে বের হয়ে আসছে নানা ধরনের প্রতারণার তথ্য। জামালপুরের ইসলামপুরে জন্ম নেওয়া শওককের বিরুদ্ধে জমি জবরদখল করাসহ নানা অপরাধের অভিযোগ আসছে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রশাসনের একাধিক দপ্তরে জমা পড়ে বিভিন্ন অভিযোগ। নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী বানিয়ে চাঁদা দাবি করারও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

%d bloggers like this: