loading...

আজ ভৈরব হানাদার মুক্ত দিবস

0

রুহুল পায়েল, ভৈরব:
আজ ১৯ ডিসেম্বর ভৈরব মুক্ত দিবস। আজ থেকে ৪৮ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে নদীবন্দর ভৈরবে পাক হানাদার বাহিনী অসংখ্য নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধবনিতাকে হত্যা, মা-বোনদের ইজ্জত লুট, ভৈরব বাজার ও গ্রামকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। তারা মিত্র বাহিনী ও ভৈরবের দামাল ছেলেদের হাতে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। মুহুর্মূহূ জয় বাংলা ধ্বনির মাধ্যমে পাকিস্তানি পতাকাকে পদদলিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশে লাল সবুজের পতাকাকে উত্তোলনের মাধ্যমে এই দিনে ভৈরবে মানুষ মুক্ত ও স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করে।
১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল চার দিক থেকে ঘেরাও করে সামরকি হেলিকপ্টার, গান বোট এবং সার্ভার জেড জঙ্গী বিমানের সহায়তায় পাক হানাদাররা শিমুলকান্দি ইউনিয়নের গোছামারা গ্রামের উত্তর দিকে ফসলি জমিতে তৎকালীন শিবপুর ইউনিয়নে পানাউল্লারচর এবং কালীপুর বাদশা বিলের পাড় ভৈরব বাজারের দক্ষিণ দিকে গৌরীপুর ছত্রীসেনা অবতরণের পর নৌ, বিমান ও স্থল বাহিনীর মদদপোষ্ট হয়ে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে নিরীহ মানুষকে হত্যা, মা ও বোনদের ইজ্জত হরণ করে ও গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে তারা ভৈরব শহরের দিকে ধাবিত হতে থাকে। এ সময় গোছামারা এবং পানাউল্লারচর গ্রামবাসী লাঠি সোটা, দা, বল্লম নিয়ে তাদের প্রতিহত করতে গিয়ে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেয়।
পানাউল্লারচরে অবতরণকারী পাক হানাদাররা বন্দরে আসার পথে আলগড়া নামক স্থানে খেয়া পারাপারের জন্য অপেক্ষমান ৩ থেকে ৪শ নারী পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ বনিতাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে শহরের দিকে অগ্রসর হয়। গুলিবর্ষণ করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে হানাদাররা এক নারকীয় অবস্থা সৃষ্টি করে ভৈরব বন্দর দখল করে নেয়। ভৈরব বন্দর দখল করার পর হানাদার ও তাদের দোসররা আলবদর রাজাকার ভৈরব নদীর পাড়সহ তিন ভাগের দুই ভাগ জ্বালিয়ে দেয় এবং ব্যবসায়ীদের দোকানের সিন্দুক ভেঙ্গে টাকা এবং গুদামে রক্ষিত মালামাল লুট করে নিয়ে যায় এবং ভৈরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বর্গকে ধরে এনে তাদের হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে এবং হানাদারদের খুশি করার জন্য তাদের তাবেদার আলবদর রাজাকাররা অসংখ্য মা বোনকে তাদের হাতে তুলে দেয়।
এরই মধ্যে ভৈরব সহ সারা দেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা রাতের বেলায় বৈদ্যুতিক ও গ্যাসের মূল পাইপ লাইন, গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে ব্রীজ ও সড়ক সেতু ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং হানাদারদের ব্যাংকারে ও তাদের দোসরদের উপর গ্রেনেড নিক্ষেপ ও চোরাগুপ্ত হামলা করে তাদের আতঙ্কিত করে তুলে। তরকারি বিক্রেতার ছদ্মবেশে ভৈরব ছবিঘর সিনেমা রোডে হামলা চালিয়ে হানাদারদের অনতম দোসর মমতাজ পাগলাসহ কয়েকজনকে হত্যা করে। হামলায় দুজন মুক্তিযোদ্ধা সহ কয়েকজন নিরীহ লোকও শাহাদৎ বরণ করে। এ হামলার পর থেকেই হানাদাররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। মিত্রবাহিনীর সদস্যরা ১২ ডিসেম্বর বি-বাড়িয়া জেলার শাহবাজপুর ও সরাইলকে শত্রু মুক্ত করে দুর্গাপুরের দিকে এগুতে থাকে। ১২ ডিসেম্বর ভোরে সূর্য উঠার সাথে সাথে তারা পানিশ্বরের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুরের দিকে এগুতে থাকে। মিত্রবাহিনীর ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন, ১৮ রাজপুত্র ডিভিশন, ১০ বিহার ডিভিশন ও ১১ ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে মুক্তিযোদ্ধারা দুর্গাপুর গ্রামের কাছে পাক হানাদার বাহিনীর ২৭ পদাতিক বিগ্রেডের সৈন্যদের কর্তৃক অতর্কিত হামলার শিকার হয়। উক্ত হামলায় ১৮ রাজপুত্র ডিভিশন, ১০ বিহার ডিভিশনের বেশ কিছু সংখ্যক সৈন্য ও অফিসার শাহাদাত বরণ করে। মিত্রবাহিনী বিমান থেকে অনবরত পাক হানাদারদের অবস্থান লক্ষ্য করে বোমা বৃষ্টি হতে থাকে এবং মিত্রবাহিনীর ভারী কামান ও গোলা উদগীরণ করতে থাকায় পাকবাহিনী রণভঙ্গ দিয়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে বাংলাদেশেরে দ্বিতীয় বৃহত্তম রেলসেতুটির পূর্ব পাশের একটি স্পেন ও পশ্চিম পাশের দুটি স্পেন ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার নিস্ফল প্রয়াস চালায়। ফলে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকহানাদারদের প্রধান জেনারেল নিয়াজী তার দলবলসহ আত্মসমর্পন করলেও ভৈরবের পাকবাহিনী সে খবর পায়নি। যার ফলে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকহানাদারদের সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট-খাট সংঘর্ষ চলতে থাকে। ১৯ ডিসেম্বর পাকহানাদার হাই কমান্ডের নির্দেশ পাওয়ার পর আত্মসমর্পনের পূর্ব মুহুর্তে তৎকালীর ন্যাশনাল ব্যাংক বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ট্রেজারিটি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে তার সমস্ত নোট আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং ব্যাংকে রক্ষিত সমস্ত মাল পানিতে ফেলে দেয় এবং ব্যাংকের লকারগুলো ভেঙ্গে স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। পাক বাহিনীর ১৯ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পন করে। আর এভাবেই একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং ভৈরবের মানুষ পাকিস্তানী পতাকাকে পদদলিত করে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত করে স্বাধীনতার মুক্তির স্বাদ লাভ করে। ভৈরবে মানুষ প্রতি বছর শ্রদ্ধাভরে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণ করে থাকে।

loading...
%d bloggers like this: