ঢাকা ৩৩°সে ১৩ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত স্বাধীনভাবে লেখালেখির জন্য অভিজিতকে জীবন দিতে হয়

আদালত প্রতিবেদক :

স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশের জন্য মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক অভিজিৎ রায়কে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হলো বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে অভিমত দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার আলোচিত এই মামলায় বরখাস্তকৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়াসহ পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও এক আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান।

নিহত অভিজিতের বাবা বাংলাদেশি পদার্থবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞান লেখক এবং মানবাধিকার কর্মী অজয় রায়। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর পুত্রশোকেই ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর অজয় রায় মারা যান। ঘটনার পরদিন তিনিই বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় এই হত্যা মামলা করেছিলেন।

৫০ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক বলেন, ‘অভিজিৎ রায় একজন বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার ছিলেন। বাংলা একাডেমির বইমেলায় বিজ্ঞানমনস্ক লেখকদের আড্ডায় অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে আক্রমণের শিকার হন। নাস্তিকতার অভিযোগ এনে নিষিদ্ধ সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্যরা অর্থাৎ এই মামলার অভিযুক্তরাসহ মূল হামলাকারীরা সাংগঠনিকভাবে অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যা করে। স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশেরজন্য অভিজিৎ রায়কে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়। অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্য হলো জননিরাপত্তা বিঘিœত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ এবং নিরুৎসাহিত করা যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশ না করতে পারে।’

পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘বাংলাদেশের জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণকে মতামত প্রকাশ ও স্বাধীন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত আসামিদের অভিন্ন অভিপ্রায় ছিল। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত আসামিদের কারো ভূমিকা ছোট বড় করে দেখার সুযোগ নেই। যেহেতু অভিযুক্ত পাঁচ আসামি মেজর জিয়া, আকরাম হোসেন, আবু সিদ্দিক সাহেল, মোজাম্মেল হুসাইন ও আরাফাত রহমান আনসার আল ইসলামের সদস্য হিসেবে সাংগঠনিকভাবে অভিজিৎ রায় হত্যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে, সেজন্য এই পাঁচ আসামির একই সাজা প্রদান করা হবে বাঞ্ছনীয়। অভিজিৎ রায় হত্যায় অংশগ্রহণকারী অভিযুক্ত আসামিরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বিচারের বাহিরে থাকা সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহী হবে এবং বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তমনা লেখকরা স্বাধীনভাবে লিখতে এবং মতামত প্রকাশ করতে সাহস পাবে না। কাজেই এ আসামিরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারে না। সেজন্য মেজর জিয়া, আকরাম হোসেন, আবু সিদ্দিক সোহেল, মোজাম্মেল হুসাইন ও আরাফাত রহমানকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। এতে একদিকে নিহতের আত্মীয়রা শান্তি পাবে এবং মুক্তমনা লেখকরা স্বাধীনভাবেমত প্রকাশে সাহস পাবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করতে ভয় পাবে এবং নিরুসাহিত হবে।’

রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামিরা হলেন, আনসার আল ইসলামের প্রধান মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া, সদস্য আকরাম হোসেন ওরফে আদনান ওরফে হাসিবুল ওরফে আব্দুল্লাহ, আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম ওরফে শামস ওরফে সাজ্জাদ, মোজাম্মেল হোসেন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার ও মো. আবু সিদ্দিক ওরফে সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে সাহাব। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬ (২) এর (অ) ধারায় অভিজিত রায়কে হত্যার জন্য এই পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

অন্যদিকে একই ধারার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর আসামি শফিউর রহমান ফারাবীকে অব্যাহতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তবে একই আইনের ৬ (২) এর (অ) ধারায় ফেসবুকে অভিজিৎকে হত্যার আহ্বান জানানোয় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

এদিকে রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জিয়া, আবু সিদ্দিক ও আরাফাত নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসার আল ইসলামের সদস্য হওয়ায় তাতের একই আইনের ৮ ধারায় ছয় মাস করে কারাদণ্ডের আদেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দণ্ডিতদের মধ্যে জিয়া ও আরাফাত পলাতক রয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় অপর আসামিদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার পর তাদের আবার কারাগারে পাঠানো হয়। রায় শোনার পর ফারাবী ছাড়া অপর আসামিদের হাসতে দেখা যায়। আর ফারাবী বিমর্ষ ছিলেন।

ওই ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউর মো. গোলাম ছারোয়ার খান জাকির বলেন, দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে ফারাবী ও আরাফাত ছাড়া অন্য সবাই ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশক দীপন হত্যা মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি।

চার্জশিটে বলা হয়, ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে অপপ্রচার ও মহানবী সা.কে নিয়ে কটূক্তি করায় মেজর জিয়ার নির্দেশ ও পরিকল্পনা এবং শারীরিক প্রশিক্ষক সেলিমের উপস্থিতিতে আনসার আল ইসলামের সদস্যরা অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করেন। হত্যার দুদিন আগে থেকে জঙ্গি সায়মন, সোহেল, আকরাম ও হাসান অভিজিৎ রায়ের গতিবিধি অনুসরণ করেন। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে আরাফাত, খলিল ওরফে আলী, অন্তু ও অনিক হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। হত্যাকাণ্ডের সময় মেজর জিয়া, শরীরচর্চা প্রশিক্ষক সেলিমসহ ঘটনাস্থল ঘিরে রাখেন। যাতে তাদের সহযোগীদের কেউ আটক করতে না পারে। হত্যাকাণ্ডের পর তারা ঘটনাস্থলে হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতি ফেলে পালিয়ে যান।

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির কাছে দুর্বৃত্তরা অভিজিৎ রায়কে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা এবং তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ ওরফে বন্যাকে গুরুতর আহত করেন। উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রে সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং বন্যা চিকিৎসক ছিলেন।




আপনার মতামত লিখুন :