ঢাকা ৩১°সে ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বই প্রকাশের দায়ে হত্যাকারীরা রাষ্ট্রের শত্রু: আদালত

আদালত প্রতিবেদক :

যারা বই প্রকাশের দায়ে একজন মানুষকে হত্যা করতে পারে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু বলে মন্তব্য করেছে আদালত। জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক এই মন্তব্য করেন।

বুধবার এই মামলার প্রধান আসামি বরখাস্তকৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়াসহ আট আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান।

নিহত দীপন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ছেলে।

রায় ঘোষণার সময় নিহত দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি জানান, ন্যায়বিচার পেয়েছেন।তবে পলাতকদের গ্রেপ্তার করে সব আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যক্ররের দাবি জানান।

রায়ে পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেন, আনসার আল ইসলামের সদস্যরা সাভারে ব্লগার রিয়াদ মোর্শেদ বাবুকে হত্যা করে। একই দিনে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে। একই দিন কাছাকাছি সময়ে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে ঢুকে এর স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুল, লেখক সুদীপ কুমার ওরফে রণদীপম বসু ও প্রকৌশলী আবদুর রহমানকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে। জিহাদের অংশ হিসেবে নিষিদ্ধ সংগঠন আনসাল আল ইসলাম বা আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যদের লক্ষ্য ছিল ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদেরকে হত্যা করে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ করা এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ধ্বংস করে দেয়া। ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করার কারণেই দীপনকে হত্যা করা হয়।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, আসামিদের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়া এবং মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে জননিরাপত্তা বিঘিœত করা। দীপনকে হত্যার জন্য মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক নির্দেশ, প্রশিক্ষণ এবং মূল হত্যাকারীদের অর্থায়ন করেন। আসামি আকরাম হোসেন, আবির, আদনান পরিকল্পনা করান। আসামি মইনুল হাসান শামীম অস্ত্র সংগ্রহ, খুনের পরামর্শ এবং মূল হত্যাকারীদের দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেন। আসামি মোজাম্মেল হুসাইন সায়মন ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার পরিকল্পনায় অংশগ্রহণসহ ঘটনাস্থল রেকি করেন। আসামি মো. আব্দুস সবুর হত্যাকারীদের প্রশিক্ষণ দেন। আসামি মো. আবু সিদ্দিক সোহেল এবং খাইরুল ইসলাম ঘটনাস্থল রেকি করেন এবং আসামি মো. শেখ আব্দুল্লাহ অর্থ একস্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেয়া করে ভিকটিম দীপন হত্যাকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিচারক বলেন, তাদের অভিন্ন অভিপ্রায় ছিল। তাই আসামিদের কারো ভূমিকা ছোট-বড় করে দেখার সুযোগ নেই। যারা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। দীপন হত্যায় প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণকারী অপরাধীরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরাসহ অন্য সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহী হবে। যেহেতু অভিযুক্ত আসামিরা আনসার আল ইসলামের সদস্য হিসেবে সাংগঠনিকভাবে দীপনকে হত্যা প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করেছে, সেজন্য তাদের একই সাজা প্রদান করাই হবে বাঞ্ছনীয়। কাজেই এই আসামিরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারে না এবং সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডই তাদের প্রাপ্য। তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং এটা হবে একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এতে একদিকে নিহতের আত্মীয়রা মানসিক শান্তি পাবে, অন্য দিকে ভবিষ্যতে এধরনের জঘন্য অপরাধ করতে অন্যরা ভয় পাবে এবং নিরুৎসাহিত হবে।

রায়ে মেজর জিয়া ছাড়া মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপর সাত আসামি হলেন, জঙ্গিগোষ্ঠী আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সদস্য মইনুল হাসান শামীম ওরফে সামির ওরফে ইমরান, আবদুর সবুর সামাদ ওরফে সুজন ওরফে রাজু ওরফে স্বাদ, খাইরুল ইসলাম ওরফে জামিল ওরফে জিসান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার ও শেখ আবদুল্লাহ ওরফে জুবায়ের ওরফে জায়েদ ওরফে জাবেদ ওরফে আবু ওমায়ের, আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব ওরফে আবির ওরফে আদনান ওরফে আবদুল্লাহ। দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম পলাতক রয়েছেন।

রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার পর তাদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।




আপনার মতামত লিখুন :



আইন ও আদালত এর সর্বশেষ