loading...

নড়াইলে জাল সনদে ভাতা তুলছেন ২০০ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা !

0

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি:
নড়াইলে ২০০ ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকৌশলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে আড়াল করে কতিথ মুক্তিযোদ্ধার নামে, একজন মুক্তিযোদ্ধার বিপরীতে একাধিক ব্যাংক হিসাব খুলে, জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত দেখিয়ে এবং গেজেটে ভুয়া নাম তুলে ও জাল সনদে ভাতা ভোগ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে ২০০ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার জন্য ভাতা বাবদ প্রতিবছর ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা গচ্ছা যাচ্ছে সরকারের। উপজেলার বদলীকৃত সমাজসেবা কর্মকর্তা অসিত বরণ সাহা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার শেখ তরিকুল আলম মন্নুসহ একটি চক্র এসব অনৈতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের প্রতিকার পেতে বাংলাদেশ আ’লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য,কালিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও মুক্তিযোদ্ধা বিএম ইকরামুল হক টুকু দূর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

আমাদের নড়াইল নড়াইলজেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়ের পাঠানো তথ্য ভিত্তিতে জানা যায় লিখিত অভিযোগে জানা যায়,উপজেলার কলাবাড়ীয়া গ্রামের একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মিনার পুত্র মোশাররফ মিনা। যার গেজেট নং-৭১২ ও মুক্তিবার্তা নং ০৪০৭০৩০১০৩। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার হিসেবে জনৈক কুলসুম বেগম ও মফিজুর রহমান নামক দুই জন ব্যক্তির নামে দুটি ভিন্ন ব্যাংক হিসাব নং এম-১৬৬ ও এম-৬৭৭ মাধ্যমে ভাতা প্রদান করছেন। একই গ্রামের ইছানউদ্দিন খানের পুত্র বাবু খান একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিবার্তা লাল বইতে ০৪০৭০৩০৩০২ নম্বর ক্রমিকে তার নাম অন্তভূক্ত রয়েছে। কিন্তু কালিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অসিত কুমার সাহা তার পরিবর্তে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তার ভাই রাবু খানকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে দীর্ঘকাল ভাতা প্রদান করে আসছেন। এ বিষয়টি বাবু খানের দৃষ্টিগোচর হলে তিনি আপত্তি জানিয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এরপরও কতিথ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধ না করে উদার প্রাণ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অসিত কুমার সাহা বাবু খানের নামেও ২০১৩ সাল থেকে ভাতা প্রদান করে আসছেন।

ফলে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার বিপরীতে উভয় ভাইয়ের নামে যথাক্রমে এম-৭০৮ ও এম-১৪৫ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রতিমাসে প্রত্যেকে ১০হাজার টাকা করে ভাতা উত্তোলন করছেন। উপজেলার নড়াগাতি থানার বাঐসোনা গ্রামের আঃ হামিদ মোল্যার পুত্র মোশাররফ হোসেন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। যার মুক্তিবার্তা নং-০৪০৭০৩০৫৯৯। এই একজন মুক্তিযোদ্ধার নামে যথাক্রমে এম-৪৪৫ ও ৬৭৪ নং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া উপজেলার গাছবাড়ীয়া গ্রামের পাঁচু শেখের পুত্র আকবার শেখ একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু সোলায়মান শেখের পুত্র আকরাম হক ৪০৬ নম্বর গেজেটে অন্তর্ভূক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। সুচতুর আকরাম হক ০৪০৭০৩০১৩৩ নং মুক্তিবার্তার বিপরীতে কৌশলে নিজের নাম অনেতিকভাবে আকবারের স্থলে প্রতিস্থাপন করে ৪০৬ নম্বর গেজেটে অন্তর্ভূক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। অথচ ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণকারী আকরাম হকের যুদ্ধের সময় বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর। আশ্চর্যের বিষয় কাউকেই বঞ্চিত না করে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় উদারহস্তে যথাক্রমে এম-৪০৯ ও এম-৬৪৪ নং হিসাবের বিপরীতে দু’জনকেই ভাতা দিচ্ছেন। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত দেখিয়ে আতœীয়কে কন্যা সাজিয়ে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর ভাতা গ্রহণের মতো ঘটনাও ঘটছে। উপজেলার বড়নাল গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে কালাম মল্লিক একজন জীবিত মুক্তিযোদ্ধা। যার মুক্তিবার্তার ক্রমিক নম্বর ০৪০৭০৩০৩১৪।

অথচ কালাম মল্লিককে মৃত দেখিয়ে জনৈক সাথী বেগমকে কন্যা সাজিয়ে দীর্ঘদিন ভাতা দেয়া হয়েছে। আবার ওই সাথী বেগমের নাম ব্যবহার করে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার তরিকুল ইসলাম মন্নুর বড় ভাইয়ের শ্যালিকা শিল্পির ছবি লাগিয়ে এম-৭৭৪ নং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরকারী টাকা আত্মসাৎ করেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বর্তমান ওই মৃত মুক্তিযোদ্ধাকে এখন জীবিত দেখিয়ে ৭৫১ নং পাশ বইয়ের বিপরীতে ৪৫৫ নং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ভাতা উত্তোলন করছেন। এছাড়া পারবিষ্ণুপুর গ্রামের মৃত মোবারক শেখের পুত্র আব্দুর রজ্জাক শেখ মুক্তিবার্তা নং-০৪০৭০৩০৩২৪ ভাতা বই নং-৫১২,হিসাব নং-এম-৫৪৫ এবং একই গ্রামের আব্দুর রজ্জাক শেখের পুত্র আমিনুর ইসলাম সাময়িক সনদ নং- ম-১৪৪৩৫৭,ভাতা বই নং-৫১১হিসাব নং-এম-৫৪৩ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। আমিনুরের ভাতা বর্তমান বন্ধ আছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের ০২.০৯.২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ৪৮.০০.০০০০.০০২.৩৪.০০২.১২.৩৪০ নং পরিপত্রে ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাচাই করার একটি নির্দেশনা আসে। যার প্রেক্ষিতে যাচাই-বাচাই কমিটিকে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজরা ম্যানেজ করে বহু অনিয়ম করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী যাদের বয়স ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ১৩ বছর হয়নি তাদের অনেকের নাম গেজেট/মুক্তিবার্তা বইতে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। অথচ তাদের বিষয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই না করেই বাচাই কমিটিকে ম্যানেজ করে তাদের ভাতা বহাল রেখেছেন।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স সংশোধনের ব্যাপকতা এর প্রমাণ। আবার অনেক মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ শিক্ষিত হয়েও এসএসসি পাশের সনদ লুকিয়ে রেখে নিয়ম বহির্ভূতভাবে এনআইডি,জন্ম সনদ সংশোধন করে পরে জমা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেকের ভুয়া গেজেট ও জাল সনদধারীর ভাতা বহাল রয়েছে। এভাবে আনুমানিক ২০০ ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, আবার কেউ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন করছেন। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার টাকার একটি অংশ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেটেও যাচ্ছে। তাই বিষয়গুলির সঠিক তদন্ত করে তা চিহিৃত করার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা। এ প্রসঙ্গে কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত উপজেলা কমিটির সভাপতি মো.কামরুল ইসলাম বলেন,‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ে যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রকৃত কাগজপত্রে প্রমাণ করতে কেউ পারে নাই। তবে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা কেউ থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে’। একই প্রসঙ্গে কালিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ তরিকুল আলম-মন্নু বলেন,‘ইতিমধ্যে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ভাতা সুবিধা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া করা হয়েছে।

তাদের সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সঠিক না পাওয়ায় উপজেলা ভাতা সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এছাড়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহিৃতকরণের জন্য তদন্ত কাজ চলছে’।কালিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অসিত বরণ সাহা ইতিমধ্যে বদলী হওয়ার কারণে তার মতামত নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে অফিস সহকারী শ্যামল কুমার দে জানান,‘উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক ভাতার যাবতীয় কাজ-কর্ম করেছি এবং এখনও করছি’।এ ব্যাপারে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়কে বলেন,‘ এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।

তদন্ত প্রতিবেদন পেলে বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। দোষীদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’ এ ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার অ্যাড.এম.এ. মতিন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুষ্টিমেয় কিছু অসৎ কর্মকর্তা তাদের নাম ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ায় আশায় দুর্নীতি করছেন। তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রæত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত’।

loading...
%d bloggers like this: