loading...

এ যুগেও মানুষ বেচাকেনা হয়?

0

বিশেষ প্রতিনিধি:

পতিতাপল্লীতে একজন কিশোরী বিক্রি হয় ৮০ হাজার টাকা !

ময়মনসিংহ শহরের গাঙ্গিনারপাড় আর ছোট বাজার এই দুই পথের মাঝে যাতায়াতের এই পতিতাপল্লীর বয়স ২ শত বর্ষেরও প্রাচীন। অবস্থিত পতিতাপল্লীতে একজন কিশোরী বিক্রি হয় ৮০ হাজার টাকা মূল্যে। ঐ কিশোরীদের কিনে নিয়ে তাদের দিয়ে জোরপূর্বক যৌন ব্যবসা করান সর্দারনী লাভলী, রুমা, মিতা, শিল্পী,ও আনু বলে জানান স্থানীয়বাসী এলাকাবাসী ।

জীবনের দামে কেনা এসব কিশোরীর জীবিকায়ন নিয়ে কেউ কি ভাবেন ? কে বা কারা এদের বিক্রি করেন ? কে বা কারা এদেরকে কিনেন ? এ যুগেও মানুষ বেচাকেনা হয় ? ওরা কি মানুষ ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের কন্ঠের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেড়িয়ে আসে নানা তথ্য । সেদিন ছিলো ২৫ আগস্ট । যৌনপল্লী থেকে তৎকালীন ওসি কামরুল ইসলামের সময় ২০ জন কিশোরীকে উদ্ধার করে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী সেদিন তিনি অভিযোগ করে সাংবাদিকদের জানান , ময়মনসিংহ শহরের পতিতালয়ে ১২ থেকে ১৬ বছরের বেশ কয়েকজন কিশোরী আছে।

এমন অভিযোগের ভিত্তিতে থানা পুলিশকে সাথে নিয়ে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ঘর থেকে ২০ জন কিশোরীকে উদ্ধার করে। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী তাদের সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী কিশোরীদের শেল্টার হোমে পাঠিয়ে দেন। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণীর দালাল চক্র বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাল চাকরি, বিদেশ পাঠানোর কথা বলে, প্রেমের অভিনয় করে এসব কিশোরীদের পতিতালয়ে বিক্রি করে। এই কিশোরীদের নির্জন ঘরে আটকিয়ে জোর পূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে। এসব কিশোরীদের এ নিষিদ্ধপল্লী থেকে কোনদিন আর বাইরে যাবার সুযোগ থাকে না ফলে পতিতাবৃত্তি পেশায় তাকে নিয়োজিত থাকতে হয়। এই ২০ কিশোরীই নয় । এর আগেও এই যৌনপল্লী থেকে ঢাকার আশুলিয়ার এক কিশোরীকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব-১৪ ।

রয়েছে আরও প্রায় ৫০ জনের মত । র‌্যাবের উদ্ধারকৃত কিশোরীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শুভ নামের এক প্রতারক পতিতালয়ে বিক্রির পর এক খদ্দেরের সহযোগিতায় বিষয়টি তার পরিবার জানতে পেরে র‌্যাবের দ্বারস্থ হয়। র‌্যাব অভিযান চালিয়ে শহরের গাঙ্গিনারপাড়স্থ এই যৌনপল্লী থেকে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে। এরকম কতো নারীকে জোরপূর্বক যৌনপল্লীতে এনে কক্ষে আটক করে রেখে তাদেরও দিয়ে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে। এমন প্রশ্ন ও উঠেছে । যৌনপল্লীর কিশোরীরা স্বেচ্ছায় নাকি অনিচ্ছায়? যৌনপল্লীতে বাড়ছে কিশোর বয়সী খদ্দেরের সংখ্যাও। এখানে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক খদ্দের আসে যারাও অপ্রাপ্ত বয়সী । এখানে রয়েছে বিভিন্ন বয়সী ৬ শতাধিক যৌনকর্মী । তন্মধ্যে শতাধিক কিশোরী বয়সের । সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা থাকলেও ভিড় বাড়ে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত । এই যৌনপল্লীতে দুই শ্রেণির খদ্দের। এক অস্থায়ী আর এক স্থায়ী। যারা কিছু সময়ের জন্য আসেন তারা অস্থায়ী।

আর যারা সারা রাত বা সারাদিনের জন্য আসেন তারা স্থায়ী। স্থায়ী খদ্দেরের সংখ্যা একেবারে কম নয় বলে দাবি তাদের সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, যৌনকর্মীদের রয়েছে ছোট ছোট নিজস্ব ঘর। একেক ঘর একেক জনের নামে পরিচিতি। কোন কোন ঘরে টাঙানো রয়েছে পতিতার বাঁধাই করা বড় ছবি। খদ্দেরদের জন্য রয়েছে অসংখ্য অবৈধ বাংলা মদের দোকান রয়েছে শতাধিক দালাল এখানে যৌনকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করেন লাভলী, রুমা, মিতা, শিল্পী, ও আনু যাদের সর্দারনী হিসাবে অবহিত করা হয় । ছোট ছোট এসব ঘর সর্দারনীরা ঘন্টা আবার দৈনিক ভিত্তিক ভাড়া নিয়ে থাকেন। সেখান থেকে ঘরের মূল মালিককে । অধিকাংশ সর্দারনী আবার ভাড়া দেন নিয়ন্ত্রণে থাকা পতিতাদের কাছে। তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয় দৈনিক ভিত্তিতে টাকা । যৌনকর্মীদের এখানে থাকতে হলে নিতে হয় রেজিস্ট্রেশন ।

কোতয়ালী মডেল থানার ওসি মোঃ মাহমুদুল ইসলাম পিপিএম যোগদান করে যৌনপল্লীর ইতিহাসে সরেজমিনে তদন্তের পর যৌনকর্মীদের রেজিস্ট্রেশন নাম্বারের তালিখা সংগ্রহ করেছেন। যৌনকর্মী শুনলেই আমরা ছিঃ ছিঃ করি নিজের পবিত্রতার পরিচয় জানান দিতে। শত শত অসভ্যতা করেও আমরা সভ্য! একদিকে যৌনকর্মীদের কথা শুনলে আমরা ছিঃ ছিঃ করে ফেনা তুলে ফেলি আর অন্যদিকে রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি অতৃপ্ত বাসনাগুলো পূরণ করতে ধরণা দেই সেই পতিতাদের কাছে। আমাদের কারণেই যারা অসভ্য আর বেশ্যা উপাধি পেয়েছে সেই আমরাই কিন্তু সভ্য। কোট-টাই-পেন্টের আবরণের ভেতর গুটিশুটি মেরে থাকা সেই অসভ্যতা কেউ দেখে না। আচ্ছা একবার চিন্তা করুন তো রাতের অন্ধকারে এই কর্মগুলোর সাথে যারা লিপ্ত হতে যায় তাদের পরিমাণটা যদি বিশাল অঙ্কের না হতো তাহলে কি এই যৌনকর্মীদের সংখ্যাটা দিন দিন বেড়ে যেতো ? চাহিদা আর যোগানের মধ্যে গভীর যোগসূত্র আছে সেটা আমরা সবাই কম বেশি জানি।

যাইহোক আমাদের ভদ্র এবং সভ্য সমাজকে দায়ি না করি। ময়মনসিংহ যৌনপল্লীতে কিশোরী কিংবা অন্য বয়সের মেয়েরা কেন এই পেশার সাথে জড়িয়ে পড়ছে? কীভাবে জড়িয়ে পড়ছে ? এটার জন্য কারা দায়ি ? তারা কি স্বেচ্ছায় আসছে এই পেশায় নাকি অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে আনা হচ্ছে এই পেশায় ? যৌনকর্মী হিসাবে সাথে জড়িত মেয়েদেরকে আমরা বিভিন্ন নামে ডাকি । তন্মধ্যে পতিতা, বেশ্যা, গণিকা, অচ্ছুত ইত্যাদি। আসলে এই পতিতাদের সবাই কি স্বেচ্ছায় আসে এই পেশায়? না। বেশিরভাগ মেয়েই নিরুপায় হয়ে এবং দালালদের পাল্লায় পড়ে প্রবেশ করে এই অন্ধকার জগতে। কার না ভালো লাগে ভদ্র সমাজে সম্মান নিয়ে বাস করতে, মাথা তুলে হাঁটতে, মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে, তিনবেলা ভরপেট খেয়ে জীবনযাপন করতে, নিজের সন্তানদের মায়া মমতায় বড় করতে, কার না ইচ্ছে করে নিজের আপন মানুষটার সাথে হাতে হাত ধরে অভিজাত কোন সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে? প্রতিটা মানুষের ভেতরেই আকাক্ষাগুলো থাকে।

কেইবা চাই লোকে তাকে মন্দ বলুক, কেইবা চাই সমাজের মানুষ তাকে দেখে ঘৃণায় থু থু ফেলুক। সাধারণ জীবনযাপন ছেড়ে তাহলে কেন এই মেয়েগুলো এই পেশায় জড়িয়ে পড়ছে? আবার এই কিশোরীদের বাইরে যারা আছেন তাদের অনেকে এক পেল্ট ভাতের জন্য, অনেকে একশ থেকে একটা হাজার টাকার জন্য, অনেকে অনাহারে পড়ে থাকা সন্তানটিকে এক বেলা খাওয়ানোর জন্য, অনেকে সদ্য হওয়া সন্তানগুলো যাতে খেয়ে-পড়ে বাঁচতে পারে সেজন্য, অনেকে পথে বসে পড়া পরিবারটিতে একটু হাসি ফুটানোর জন্য। এইরকম আরো হাজারটা কারণ। আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে দুনিয়াতে এত কাজকর্ম পড়ে থাকতে এই পেশা কেন? বেশিরভাগই মেয়েই এই পেশায় জড়িয়ে পড়ে শুধু মাত্র টাকার জন্য। কাউকে রেস্টুরেন্টে কাজ দেয়ার, কাউকে গার্মেন্টসে কাজ দেয়ার, কাউকে অভিনয়ে সুযোগ দেয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে একটু একটু করে নিয়ে আসে এই নিষিদ্ধ জগতে। সবকিছু পরিষ্কার হবার পর পালিয়ে আসার আগেই আটকা পড়ে যায় তারা।

একটু একটু করে এই অদ্ভুত চোরাবালিতে ডুবে যেতে থাকে। তখন বাস্তবতা মেনে নিয়ে মনস্থির করে ফেলে। কে এই স্বপ্নগুলো দেখাচ্ছেন? ভাবতেও অবাক লাগবে যখন অনেকেই নিজ দূরাত্মীয়দের প্ররোচণায় এই পথে চলে আসে। কারো চাচা, কারো খালা, কারো ফুপা, কারো বড় ভাই । এক মেয়েকে তার ফুপা ময়মনসিংহে নিয়ে এসেছিল কাজ দেয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে। গ্রামের সেই সরল মেয়েটি সাত-পাঁচ না ভেবেই এসে পড়েছিল। তারপর তার ফুপা তাকে বিক্রি করে দেয় এক যৌনকর্মীর কাছে। তারপর থেকেই শুরু হয় তার এই জগতে পদচারণা। স্বাভাবিক জীবনে কি ফিরতে ইচ্ছে করে না? পরিবারের কথা কি মনে পড়ে না?প্রশ্নগুলোর উত্তরে ঐমেয়ে বলে, ‘কার কাছে ফিরব? পর পুরুষের কথা বাদই দিলাম যে বাবা তার মেয়ের দিকে অন্য চোখে তাকায় তার কাছে ফিরে যাব? আরেকজন স্বামীর পরিবার থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।

তারপর ছেলেকে নিয়ে অনেক জায়গায় সাহায্যের জন্য হাত পেতেছে কিন্তু আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ তার জন্য সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়নি। একটা কাজের জন্য অনেকের কাছেই ধরণা দিয়েছে কিন্তু কেউ সাহায্য করেনি। তিন সন্তানের সংসার। একদিন এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘আম্মু গতকালও বিস্কুট খেয়ে থেকেছি, আজো কি বিস্কুট খেয়ে থাকবো ? কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক দালালের খপ্পরে পড়ে যায়। জোরজবরদস্তি করে একটি বাসায় নিয়ে গিয়ে কয়েকজন মিলে ধর্ষণ করে তাকে। ছেলে মেয়েদের মানুষ করার স্বপ্নে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে পারে না।

সেই দালালের নামে আদালতে মামলা করতে গিয়ে এক মহুরিকে প্রস্তাব দিয়ে বসে তার সাথে ব্যবসা করার। তার পর থেকে জড়িয়ে পড়ে দেহ ব্যবসায় । তার মত অনেকেই মিথ্যা আশ্বাস আর প্রতারণার শিকার হয়ে এসে পড়েছে এই নিষিদ্ধ অন্ধকার জগতে। যৌনকর্মদের এই পেশায় জড়িয়ে পড়ার জন্য কারা দায়ী ? আমাদের সমাজে মানুষ নামে কিছু অমানুষ আছে যারা নারীকে পণ্য হিসেবে চিন্তা করে এবং এক হাত থেকে অন্য হাতে তাদের যোগান দিয়ে কড়কড়ে নোট পকেটে ভরে তাদের জন্য, আমাদের কিছু রক্ষকবাহিনী আছেন যারা মূলত রক্ষক নয় ভক্ষক তাদের জন্য পতিতাবৃত্তির মত পথ বেছে নিচ্ছে অনেক মেয়ে। এই সমাজের কেউ তাদের দিকে একটুও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি, খাবারের জন্য একটা কাজ দেয়নি, একটু ভালোবাসাও দেয়নি।

আর দালাল নামের কিছু অমানুষ এই দূর্বলতাটিকে কাজে লাগিয়ে কাজ দেয়ার নামে বিক্রি করে দিচ্ছে কোন যৌনপল্লি­তে! তাদের অনেকের ভেতরেই জোর করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে । জীবনের দামে কেনা জীবিকা’ একূল-ওকূল হারানো মেয়েগুলো তখন উপায়ান্ত না দেখে মেনে নেয় এই অন্ধকার আর কুৎসিত জগতটাকে! অনেকে ফিরে যেতে চায় কিন্তু আর ফিরে যেতে পারে না স্বাভাবিক জীবনে। কোন না কোনভাবে আটকা পড়ে যায় দালালচক্র নামের কিছু অমানুষের বলয়ে! অনেকেই পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে কিন্তু কেউ কেউ পারে আর কেউ কেউ ব্যর্থ হয়। অনেকে যারা পারহতে ব্যর্থ হয় তাদের সহ্য করতে হয় অসহ্য নির্যাতন এবং অমানুষিক অত্যাচার।

আর ফিরে এসেও কি সবাই সভ্য সমাজে প্রবেশ করতে পারে ? মানুষ হিসেবে কি বাঁচতে পারে? আমাদের সভ্য সমাজ কি ফিরে আসা সেই মানুষগুলোকে আমাদের মধ্যে থাকার জায়গাটুকু দিতে পারি? আমাদের মতো বাঁচার নিশ্চয়তাটুকু দিতে পারি? যে সমাজ তাদেরকে পতিতা, বেশ্যা, গণিকা, অচ্ছুত ইত্যাদি বলে ঘৃনাা আর অশুচিতার চাদরে ঢেকে দিয়েছি তারা আর যাই হোক সবকিছু ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সক্ষম হয় না কখনো। কারা আসলে এই পেশার পেছনে আছেন ? কীভাবে তারা এসেছে এই পেশায়? কী বলে তারা এই জীবনটা কি পছন্দের? সদ্য কৈশোরে পা দেয়া মেয়েরা। যাদের বয়স আঠারোর কম বয়স। আঠার বছরের কম বয়সের মেয়েদের এই পেশায় যুক্ত করা অপরাধ কিন্তু এই বয়সের মেয়েরাই এই পেশার নির্মম শিকার হচ্ছেন। তাদের বাড়ন্ত শরীরকেই ব্যবসার জন্য বেছে নেয় দালালরা। খুব সহজেই তাদেরকে মিথ্যে স্বপ্নের আশায় ডুবিয়ে ফেলা যায়।

কিন্তু যখনই এই মেয়েরা সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে আসতে চেষ্টা করে তখনই তাদের উপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। ভয়-ভীতি, হুমকি-ধামকি দিয়ে দামিয়ে ফেলে তাদেরকে। এক পর্যায়ে নির্মম বাস্তবতা মেনে তারাও বেছে নেয় এই নিষিদ্ধ জীবন। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদেরকে গরু মোটাতাজাকরণের ঔষুধ খাইয়ে, বিভিন্ন ড্রাগস দিয়ে বাড়ন্ত শরীর বানিয়ে লাস্যময়ী করে তোলা হয়। দালালদের কাছে তারা মানুষ না একেকটা পণ্য। যার দাম বেশি সে ভালো পণ্য, যার দাম কম সে মন্দ। যে ভালো উপার্জন করতে পারে খদ্দেরকেতৃপ্তি দিয়ে সে একটু ভালো জীবনযাপন করে আর যে সেটুকু পারে না তাকে পদে পদে শিকার হতে হয় নির্যাতনের। তের- চৌদ্দ বছরের এক মেয়ে ছদ্ম নাম মারিয়া পারভিন বিনা। তাকে বাজার থেকে ধরে এনে বিক্রি করে দিয়েছিল এক সর্দারনির কাছে। সম্প্রতি মানবাধিকার কর্মীদের উদ্ধার করা কিশোরীদের মধ্যে সেও একজন ।

কী চায় যৌনকর্মীরা ? পরিস্থিতির শিকার হয়েই হোক, নিরুপায় হয়েই হোক কিংবা বাধ্য হয়েই হোক তারা জড়িয়ে পড়েছে এই অন্ধকার জীবনে। কিন্তু তারাও বাঁচতে চায়। মানুষ হিসেবেই বাঁচতে চায়। তাদের ছেলে মেয়েদের তারা এই অন্ধকার জীবন থেকে বাইরে রাখতে চায়। তাদের অনেকেই বেঁচেই আছে শুধুমাত্র তাদের সন্তানদের মানুষ করে রেখে যেতে। কিন্তু সভ্য সমাজে তাদের ঠাই কোথায়? পতিতা মার কলঙ্ক তাদের সন্তানদের গায়ে মেখে যায়। তাদেরকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয় সভ্য সমাজ থেকে। কেউ মিশতে চায় অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য বলে। অনেক পতিতাই স্বপ্ন দেখে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সভ্য সমাজের অংশ হবে একদিন। স্বাভাবিক নাগরিকের মতো সুযোগ সুবিধাগুলো পাবে। তাদেরও ইচ্ছে করে একটু মানুষ হিসেবে বাঁচার। কিন্তু সরকার এই পেশাকে বৈধতা দিয়েছে।

কিন্তু বৈধতা দিয়ে কি তাদের সম্মান ফিরে আসবে? সমাজের অংশীদার হয়ে বাঁচতে পারবে? জানি না আমাদের এই সভ্য সমাজে কোনদিন তারা মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারবে কিনা! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সর্দারনী জানান, দালাল বা অন্য কোনভাবে নতুন কেউ এ পেশায় আসতে চাইলে প্রথমে তাকে নেয়া হয় শহরের ১ নং পুলিশ ফাঁড়িতে পরে পুলিশ মেয়ের সাক্ষাৎকার নেন। বয়স, ঠিকানা এসব জেনে বৈধ মনে করলে তার গ্রীন সিগন্যাল পেলেই ওই মেয়েকে নেয়া হয় আইনজীবীর কাছে। এরপরই এফিডেভিটের মাধ্যমে যৌনকর্মী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। বেশ ক’জন সর্দারনী আমাদের কন্ঠকে বলেন, পুলিশের গ্রীন সিগন্যাল পেতে খরচ করতে হয় একটি অংকের টাকা। আর সুন্দরী হলে বেশি । যদিও এক্ষেত্রে বয়সের বিষয়টিকে খুব একটি গুরুত্ব দেয়া হয় না । কিশোরী কিংবা অপ্রাপ্ত বয়সের কিনা তাও যাচাই- বাছাই করা হয় না এখানে। সূত্র বলছে, গরু মোটাতাজাকরণ বড়ি ওরাডেক্সন । ময়মনসিংহ যৌনপল্লীতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের এসব খাওয়ানো হচ্ছে । এতে তাদের শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মেয়েটার নাম বলছি না । ১৪ বছর বয়স তার। বয়সের একটা মেয়ে লেখাপড়া করবে, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখবে এটাই স্বাভাবিক । কিন্তু সবার ভাগ্য তো একরকম হয় না। তাই অল্প বয়সী হাসিকে কাজ করতে হচ্ছে একজন পতিতা হিসেবে।

কোনো কোনো দিন তাকে এক ডজন পুরুষকেও খুশি করতে হয় বলে সে জানিয়েছে । অপরএক সূত্রে জানাগেছে, একেকজন মেয়েকে কিনতে ৮০ হাজার টাকা আবার লক্ষাধিক টাকা খরচ হয় । সর্দারনীদের সঙ্গে কথা বলে এতথ্য জানা গেছে । অন্যভাবে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি এ তথ্য । অভাবের কারণেও অনেকে পতিতাবৃত্তি বেছে নেয় । স্থানীয় প্রশাসন বা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পতিতালয়ের কোনো যোগসাজশ আছে কীনা জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘‘হ্যাঁ, তা থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না ! এদিকে, অল্প বয়সি মেয়েদের আকর্ষণীয় করে তুলতে ওরাডেক্সন খাওয়ানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে । এটা খেলে স্বাস্থ্য বাড়ে । ফলে অল্পবয়সিদের দেখতে বয়স্ক মনে হয় ।

কোনো মেয়ে খেতে না চাইলেও তাদের জোর করে ওরাডেক্সন খাওয়ানো হয় । নাম প্রকাশে একজন বলে, প্রথমে দিকে ওরাডেক্সন খেতে চাইত না। এজন্য সর্দারনীরা তাদেরকে মারধর করে । ওরাডেক্সন খেলে কী হয়? জানতে চেয়েছিলাম তার কাছে । তিনি বলেন, ‘‘ঠিক কী হয় সেটা আমি বলতে পারব না । তবে পতিতালয়ে এই বড়ি পাওয়া যায় । এটা খেলে অল্প বয়স্কদের বড়োসড়ো মনে হয় ।

 

loading...