loading...

রমজান মাস যেভাবে কাটাবেন

0

শুরু হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ইবাদতের মাস, রমজান। রমজান মাসকে ঘিরে আমাদের অনেক অনেক পরিকল্পনা থাকে। এর অন্যতম হচ্ছে- ইফতার, রমজান কেন্দ্রিক ইবাদত-বন্দেগি ও ঈদ শপিং।

আমার প্রিয় শিক্ষিকা খাদিজা বলতেন, চোখ বন্ধ করো, মাথা ওপরে তুলো, কল্পনা করো যে- অনেকগুলো ফানুস উড়ে যাচ্ছে তোমার মাথার খুব কাছ দিয়ে। তুমি চাইলেই সেগুলো ধরতে পারো, আবার ইচ্ছা করলে অল্প কিছু। মনে না ধরলে একটাও না। এবার চোখ খুলো।

শুনো! এইযে ফানুসগুলো, এগুলো মনে করো একেকটা সুযোগ। মানে ইবাদতের সুযোগ। আর এই সুযোগগুলো তুমি বেশি বেশি পাবে রমজান মাসে।

এখন তোমার ইচ্ছা, চাইলে সব সুযোগ নিতে পারো, চাইলে কিছু নিতে পারো আর চাইলে একটাও না।

সিয়াম সাধনার মাস আসলেই যেন আমি এমন শত শত ফানুস দেখি। আর দেখি সেগুলো কিভাবে উড়ে চলে যাচ্ছে, অথচ ধরতে পারি না!

ইমাম শায়খ আইয়ুব রাহমাতুল্লাহি আলাইহির খুব ইচ্ছে ছিল, ইন্তিকালের আগে অন্তত একবার রমজানে মসজিদে নববীতে আবার তারাবি পড়াবেন। আল্লাহতায়ালা তার এই ইচ্ছে কবুল করেছিলেন। পরেরবার রমজান মাসের আগেই ইন্তিকাল করেন। মানুষ রমজানকে ঘিরে কত পরিকল্পনা করে। কিন্তু যখন ডাক আসে, তখন সঙ্গে সঙ্গেই সেই ডাকে সাড়া দিতে হয়।

একবার ভাবুনতো! আপনি কি বেঁচে থাকবেন আগত রমজান পর্যন্ত? উত্তর, এর কোনোই নিশ্চয়তা নেই।

তাই বলি, রমজানের ঈদের শপিংগুলো আগেই করে ফেলুন। বাজার হচ্ছে আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে অপছন্দের জায়গা। আমরা রমজানে সেখান যেয়ে সময় নষ্ট করবো? কত বড় ক্ষতি হচ্ছে আমাদের, একবার ভেবে দেখুনতো!

রান্না-বান্না
রমজান হলো সংযমের মাস। অথচ হিসাব করে দেখুন, অন্য মাস থেকে রমজানে আমাদের বেশি খাওয়া হয়। সংযমটা আসলে কোথায় করছি আমরা? একটু সময় না খেয়ে থেকে তো পরে সেটা পুষিয়ে নিচ্ছি ভালো করে। সংযমতো হবে চোখের, কানের, জিহ্বার, অন্তরের, দুই পায়ের মাঝের অংশের।

অথচ আমরা মাগরিবের পরেই ফিরে যাই অন্ধকারে। ইচ্ছেমত খাওয়া-দাওয়া, রমজান উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানাদি দেখা, জামা-কাপড়ের নতুন নতুন কালেকশনের সন্ধান করা- আরও কতকি!

আপনি জানেন, সামান্য কয়টা খেজুর একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট। কাজকর্ম করতে, ইবাদত-বন্দেগি করতে। অর্থাৎ মেরুদন্ডটা খাড়া রাখতে যে শক্তি লাগে তা পূরণ করে দেয় সামান্য কয়টা খেজুর। আর খাওয়ার সুন্নত হচ্ছে পেটের ৩ ভাগের এক ভাগ খাওয়া। অথচ আমরা? ভাজা-পোড়া, বুট-মুড়ি এসব এত বেশি খাই যে, শ্বাসটাও ফেলতে কষ্ট হয়!

খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমরা রমজান মাসে ইবাদত-বন্দেগির পেছনে যে সময় দেই, তার থেকে তিন গুণ বেশি দেই রান্না ঘরে। এমনটা মনে হয় যেন, রমজান মাস মানেই ইফতার পার্টির সময়!

বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। শুধু নিজে না, পরিবারের সবাইকেই অভ্যাস করাতে ও বুঝাতে হবে; রমজানে খাওয়া খুব কম হবে। রোজা অবস্থায় রান্নাঘরে কাজ করা খুব কষ্টের। যেকোনো একটা আইটেম হলেই হয়, ইফতার করাটা মূল উদ্দেশ্য, খাবার না।

আর হ্যাঁ, আমরা অনেকে ভুলে যাই যে; রান্না ঘরের যে কাজ করছেন তিনিও মানুষ। তারও হিসাব-নিকাশ আছে। তাকেও আমল নিয়ে দাঁড়াতে হবে মাওলার সামনে। তাই তারও ইবাদত-বন্দেগি করা জরুরি। আর আমাদেরও উচিৎ ঘরের কাজের লোকদের কাজের বোঝা কমিয়ে তাকেও ইবাদত করার সুযোগ করে দেওয়া।

এবার আসা যাক ইবাদত-বন্দেগি প্রসঙ্গে। প্রথমে হাদিসটা পড়ে নেই- সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বলেছেন, আমার বান্দা কোনো পুণ্যের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না ফরজ ব্যতীত। আর ফরজের পর সে সর্বদা নফল আদায় করলে আমার অধিক নৈকট্য অর্জন করতে পারবে। অবশেষে আমি তাকেই ভালোবাসতে থাকি। অতঃপর আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শুনতে পায়; আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখতে পায়; আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে পাকড়াও করে; আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। আর সে যদি আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করে, আমি তাকে অবশ্যই তা প্রদান করি। আর যদি সে আমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় প্রদান করি। -সহিহ বোখারি: ৬৫০২

নফল ইবাদত প্রসঙ্গ
নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহতায়ালার খুব কাছে চলে যায়। যেখানে মানুষ ফরজ আদায়ে অলসতা করে, সেখানে কিছু মানুষ আছে ফরজ-ওয়াজিব শেষ করে নফলে মনোযোগী হয়। রাত জাগে, রুকু-সিজদা করে, কোরআনে কারিম তেলাওয়াত করে। তারাই তো আল্লাহতায়ালার প্রিয়।

রমজান হচ্ছে নফল ইবাদতের অন্য রকম একটা মাস। এমাসে আসলে আমাদের উচিৎ সমস্ত কাজ ফেলে, ঘুম কমিয়ে দিন-রাত শুধু ইবাদত-বন্দেগি করা। কোরআন খতম দেওয়া, নামাজ আদায় করা, দান-সদকা করা ও গরিবকে খাওয়ানো ইত্যাদি।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায়ের পাশাপাশি সুন্নতগুলো (ফজরের আগে দুই, জোহরের আগে চার ও পরে দুই, মাগরিবের পর দুই ও ইশার পর দুই রাকাত) আদায় করবো। তারাবি ও তাহাজ্জুদ পড়বো। তারাবি ২০ রাকাত না ৮ রাকাত এটা নিয়ে মনে দ্বন্দ্ব রাখার কোনো মানে নেই। তারাবি ২০ রাকাত। মক্কা-মদিনায় ২০ রাকাতই পড়া হয়। আপনি কম পড়তে চান সমস্যা নেই, বেশি পড়লে বেশি সওয়াব। ২০ রাকাত পড়ার পর চাইলে আরও নফল নামাজ আদায় করুন, রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করুন, আর সারাদিন কোরআন তেলাওয়াত তো থাকছেই। এরই ফাঁকে জিকির করুন, মিসওয়াক করু, মানুষকে ভালো কাজের প্রতি আহবান করুন, মন্ত কাজ থেকে বিরত থাকতে বলুন। দ্বীনি কাজ চালু রাখুন। মনে রাখবেন, যে কাজই করবেন- নিয়তটা রাখুন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাহলে ইনশাআল্লাহ কাজের সঙ্গে নেকিও মিলে যাবে।

loading...