loading...

যাত্রা-নায়ক এম অালীম এখন ধর্ম-কর্মে ব্যাস্ত ————–

0

অানোয়ার হোসেন শাহীন:

বরেণ্য যাত্রাশিল্পী, নায়ক  এম অালীমের জীবদ্দশায়  সাক্ষাৎকার নেয়ার অামার সুযোগ হয়েছিল।  দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি ” যাত্রা-নায়ক এম অালীম এখন ধর্ম-কর্মে ব্যস্ত”-এই শিরোনামে  ১৯৯৯ ইং সালের ২২ মে জাতীয় “দৈনিক  প্রাইম” পত্রিকায়  “চিত্রাকাশ “পাতায় ছাপা হয়। পরবর্তিতে এই গুণী শিল্পী  ২০০৩ ইং সালে ৫ জানুয়ারি মৃত্যুবরন করেন। মরহুমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে  সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।এম অালীম দেশের  একজন প্রখ্যাত  যাত্রাশিল্পী এবং নাট্যব্যক্তিত্ব। তিনি ময়মনসিংহ  জেলার গৌরীপুর থানার  শালীহর গ্রামে ১৯৩০ সালে  জন্মগ্রহণ  করেন।বাল্যকাল থেকেই  নাটকের প্রতি তাঁর প্রবল অাগ্রহ  জাগে। স্থানীয়  রাজেন্দ্র  কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের  শিক্ষা জীবনের  শুরুতেই গৌরীপুর জমিদারের তৈরী নাট্যমঞ্চে  দেশের  সেরা অভিনেতা ভূপাল সেন,মাখন ভাদুরী প্রমূখের অভিনয় দেখে  তিনি অভিনেতা হবার স্বপ্ন দেখেন।

বারো জমিদারের অাবাসভূমি  রাজগৌরীপুর একসময় সাংস্কৃতির পীঠস্থান  ছিল।বিশেষ  করে সংগীত ও নাটকে সে সময় গৌরীপুরকে মুখরিত  করে তোলতো।এ ছাড়া জমিদার ধীরেন্দ্র  প্রসাদ  লাহেড়ী একজন গুণী  অভিনেতা ছিলেন।

এম অালীম তৎকালীন তরুণ সম্প্রদায়ের  নামে স্থানীয়  নাট্যসংগঠনে নিজেকে সংপৃক্ত  করে নাটকে  অভিনয়ের সুযোগ  পান এবং  নাট্যশিল্পী  হিসাবে  বিভিন্ন  নাটকে  অভিনয় করেন। ইতিমধ্যেই তাঁর দর্শকপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।পরবর্তিতে বাংলা ১৩৬৪ সালে চট্টগ্রামের বাবুল  অপেরার  মধ্যদিয়ে তিনি যাত্রা জগতে  প্রবেশ  করেন এবং অভিনয়কে পেশা হিসাবে  বেছে নেন। দেশ স্বাধীন  হবার পূর্ব পর্যন্ত  রঞ্জন, নবযুগ, বুলবুল,নবরঞ্জন  প্রভৃতি  অপেরায় দাপটের সাথে কাজ করেন।মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গশ্রী, গনেশ,পূর্বাচল,বলাকাসহ অন্যান্য অপেরায় সুনামের সাথে অভিনয় করেন।শুরুতে  ৫৫ টাকা থেকে সর্বশেষ  ১৮ হাজার  টাকা বেতনে কাজ করেন।

সমালোচকদের দৃষ্টিতে কোন কোন চরিত্রে নটরাজ  অমলেন্দু বিশ্বাস অসাধারণ, অাবার কোন কোন দিক থেকে এম অালীম শীর্ষে।যাত্রাশিল্পে তার জীবন ৩৬ বছর এ মাধ্যমে  বিচরণ করেন। তার মধ্যে ৩২ বছর নায়ক /পরিচালক হিসাবে সুনামের  সাথে কাজ করেন।তাঁর পালার সংখ্যা দু- শতাদিক। এই সুদর্শন নায়ক  সোহরাব রোস্তমের-  সোহরাব, পুষ্প চন্দনের-চন্দন,রাহুগ্রাসের -বিজয় ও মা মাটি মানুষের শিবঠাকুরের ভূমিকায় অভিনয় করে  তিনি বিপুল সুনাম অর্জন করেন।

শিল্পকলা একাডেমীতে যাত্রা শুরু হওয়ার পর প্রথম  রজনীতে চমৎকার অভিনয় করে কতৃপক্ষকে তাক লাগিয়ে দেন।কতৃপক্ষ খুশি হয়ে তাকে তার নিজের একটি  প্রোট্রেট উপহার দেয়। তিনি ৮০ দশকে  অভিনয়ে স্বর্ণ পদক লাভ করেন।

তিনি বলেন,চিত্তবিনোদনের জন্য যাত্রাশিল্প  একটি অন্যতম মাধ্যম।অথচ গ্রাম-বাংলার  বিনোদন  যাত্রা শিল্পের ঐতিহ্য অাজ হারাতে বসেছে।

যাত্রার স্বপ্নপুরুষ এম অালীম  স্মৃতিচারণ করে বলেন,এক সময় অামার  জনপ্রিয়তা এতো তুঙ্গে  ছিল যে, বগুড়া,দিনাজপুর, রাজশাহীতে সিনেমা হল পর্যন্ত  বন্ধ হয়ে যেতো। মানুষ সিনেমা না দেখে যাত্রানুষ্টানে ভীর করতো।  ফলে দিনাজপুরে এক হল মালীক  গুন্ডা বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে  যাত্রানুষ্টান  পন্ড করে দেয়। কিন্ত  অাজ সেই অবস্থা  নেই।

এম অালীম এক প্রশ্নের জবাবে বলেন,অাজ অনেক শিল্পী  কলাকুশলী  মানবেতর জীবন যাপন করছে। অাজ যাত্রার  পারমিশন  নিয়ে চলছে, যাত্রার  নামে মদ,জুয়া ও নগ্ন নৃত্য কোন কিছুই বাদ যায় না। এটা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, অন্যান্য শিল্প মাধ্যমে  সরকার যে ভাবে পৃষ্টপোষকতা করছে  এই ভাবে এ শিল্পে ও পৃষ্টপোষকতা  প্রয়োজন।তবেই যাত্রাশিল্পের  হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

এম অালীম বলেন,চিত্ত সরকার,অমলেন্দু বিশ্বাস,নকুল কর্মকার,রমজান ভূইয়া, উদয় নারায়ণ,  নন্দী রাণী,মোসলেম,রহিম,শিরিন,মায়া চক্রবর্তী,  ইলা, হাবিব  সারোয়ার, পরিতোষ বাবু, মিলন কান্তি দে প্রমূখ  শিল্পীরা  ছিলেন নিত্যকার অর্থে গুণী  শিল্পী। তাদের অনেকের  সাথে কাজ করার সুযোগ  হয়েছে  অামার এবং তাদের সাথে কাজ করে অামি অানন্দ  পেয়েছি।

তিনি অাক্ষেপ ও দুঃখ প্রকাশ  করে বলেন, অভিনয় শেষ জীবনো কেউ কোন শিল্পীর খোঁজখবর রাখে না। এই গ্রাম বাংলার  অনেক দুস্থ ও অসাহায়  শিল্পী অাছেন যাদের দেখার কেউ নেই।তাদের প্রতি সবাইকে নজর দিতে হবে।এম অালীমের বয়স এখন ৭০ এর কাছাকাছি।বর্তমানে  এই বায়োবৃদ্ধ শিল্পী তাঁর গ্রামেরবাড়ী শালীহরের নিভৃত পল্লীতে ধর্মকর্ম  নিয়ে ব্যাস্ত অাছেন।

এম অালীমের পিতা  মোঃ তমিজ উদ্দিন মুন্সি। তারা দুভাই বোন।অালীমের দুই ছেলে এবং পাঁচ মেয়ের  মধ্যে  প্রথম ছেলে মোঃ অানোয়ার  হোসেন বর্তমানে  ২ নং গৌরীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

(উল্লেখ্য- পরবর্তিতে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ময়মনসিংহ এক অনুষ্টানে  যাত্রাশিল্পে অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে সংবর্ধনসহ পুরস্কারে ভূষিত করেছিল।)

 

loading...
%d bloggers like this: