loading...

ইট ভাঙ্গার নারী শ্রমিক রূপমনিদের গল্প

0

স্টাফ রিপোর্টার:

দু’মুঠো অন্নের সংস্থানে ৭০ বছর বয়সেও ইট ভাঙ্গার কাজ করে যাচ্ছেন রূপমনি। ৪০ বছর ধরে তিনি হাতুড়ী দিয়ে ইট ভেঙ্গে সুরকী করার কাজ করে আসলেও তার ভাগ্যের কোন উন্নয়ন ঘটেনি। নিত্যপন্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ, শুধু বাড়েনি রূপমনিদের মত শ্রমিকের মজুরী। তাইতো তাদের মনে নেই কোন বিনোদন, নেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন। রূপমনির বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরে নতুন বাজার এলাকায়। তার স্বামী চন্দ্রিকা গৌড় ৩০ বছর আগে মারা যান। বিয়ের পর স্বামীর অভাব-অনটনের সংসারের হাল ধরতে ইট ভাঙ্গার কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেন রূপমনি। এ পেশার আয় দিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোন রকমে তার তিন সন্তানকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন।

রূপমনি জানান ইট ভাঙ্গার কাজ করে বর্তমানে তিনি প্রতিদিন দু’শ থেকে আড়াই’শ টাকা আয় করে থাকেন। মাঝে মধ্যে কোন দিন কাজ না পেয়ে ঘরে বেকার বসে থাকতে হয়। প্রতিদিন মাত্র দু’শ থেকে আড়াই’শ টাকা রোজগারে তার নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন দফায় দফায় বাড়লেও, বাড়েনি তাদের শ্রমের মজুরী। সেই মান্ধাতা আমলের ধার্যকৃত মুজুরীতেই এখনো তারা ইট ভাঙ্গার কাজ করে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে রূপমনির মত এ পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন গৌরীপুরে প্রায় শতাধিক নারী। দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় নিয়োজিত থেকে কুলুর বলদের মত খাটুনি কেটেও তাদেরও ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। এসব পরিবারের গৃহকত্রী, অবিবাহিত মেয়ে, ছেলে বউ, নাতি বউ, অর্থাৎ বংশানুক্রমে গৃহবধূরা স্বামীর আয়ের উপর ভরসা না করে প্রায় দীর্ঘদিন ধরে ইট ভেঙ্গে সুরকী করার আয় দিয়ে স্বামী-সন্তানদের জীবন-জীবিকার বিশাল ব্যয়ের যোগান দিয়ে চলেছেন। নিজ উপজেলা ছাড়াও পাশ্ববর্তী এলাকায় বাজার, রাস্তা, মহল্লা-গ্রাম-গঞ্জে যে কোন নির্মান কাজে ইটের সুরকী’র প্রয়োজন হলেই ডাক পড়ে কারিগর এ গৃহবধূদের। এরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্বামী সন্তান ও নিজের জন্য সামর্থ্যনুযায়ী কেউ কিছু রান্না করে আবার কেউ আগের দিনের পান্তা ভাত-বা রুটি তড়িঘড়ি মুখে দিয়ে হাড়কাঁপানো শীত, প্রচন্ড রোদ ও প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাড়ী থেকে বের হয় কাজের উদ্দেশ্যে।

এসময় এদের হাতে থাকে একটি হাতুরী ও কোমড়ে গুজা থাকে কাজের সময় হাতুরীর অসতর্ক ঘা থেকে আঙ্গুল রক্ষা করতে নিজেদের তৈরী টুকরো মোটা চামড়ার আঙ্গুল বন্ধনী, আর পলিথিনে ভরা অল্প চুন-পান-সুপারী। এরা দলবদ্ধভাবে কোনদিন কাছে আবার কোন দিন অনেক দূর পায়ে হেটে বা বিভিন্ন যানে পথ পাড়ি দিয়ে ইট ভাঙ্গার গন্তব্যে পৌছায়। সারাদিন যে যত বেশি ইট ভাঙ্গে তার তত বেশী আয় হয়। আবার এরা যৌথভাবেও ইট ভেঙ্গে দিন শেষে নিজেদের মজুরী ভাগ করে নেয়। তাই একদিনে বেশী আয়ের জন্য ইট ভাঙ্গার ক্ষেত্রে এদের একেক জনের হাতুরী ও আঙ্গুলে চামড়ার বন্ধনী পড়া হাত চলে দ্রুতগতিতে। আঙ্গুলে মোটা চামড়া বন্ধনী থাকার কারনে অসতর্ক মুহুর্তে হাতে হাতুরীর জোর ঘা পড়লেও এরা কোন ব্যথা পায়না বা থেতলে যায় না। এর পরও দিন শেষে এদের একেক জনের হাতে মজুরী আসে দেড় থেকে দু’শ টাকা। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদারী কাজ হলে সপ্তাহে এদের মজুরী মিলে। আবার কোন কোন সময় অসৎ ঠিকাদারের পাল্লায় পড়ে এরা সপ্তাহ-মাস কাজ করেও প্রাপ্য মজুরী পেতে চরম ভোগান্তির সম্মুখীন হয়। কোন কোন ঠিকাদার বা ব্যক্তি বিল পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে মাস-বছর ঘুরিয়ে মজুরীর অর্ধেক পরিশোধ করে বাদবাকী মজুরী আর কোন দিন পরিশোধ করেন না।

ইট ভাঙ্গার কারিগর গৃহবধূদের কাজের মজুরীর টাকা ঠকানোর এরকম নজির রয়েছে ভুরি ভুরি। ইট ভাঙ্গার ফাঁকে ফাঁকে মমিনপুর গ্রামের মৃত বিশ্বনাথের বিধবা স্ত্রী শেফালী (৫২) জানান ২৭ বছর আগে সংসারে নতুন বউ হয়ে আসার পর থেকেই সে ইট ভাঙ্গার কাজে নামে। স্বামীর মৃত্যুর পর বাড়ীর ভিটে‘র জায়গা ছাড়া আর কোন সহায় সম্পত্তি না থাকায় বর্তমানে ইট ভাঙ্গার আয় দিয়েই ছোট ছোট ৩ মেয়ে ২ ছেলে ও নিজের ভরন-পোষন চালিয়ে যাচ্ছেন। একই পেশায় নিয়োজিত থেকে ভূমিহীন চেঙ্গুর স্ত্রী আরতী বালা (৪০), দুলালের স্ত্রী শান্তি (৪৫), শ্যমলালের স্ত্রী পতুল (৪০), মৃত কৃষ্ণের স্ত্রী বাসন্তী (৫৫), মৃত অনুপের স্ত্রী গোলাপী (৭০), দীলুর স্ত্রী মালতি (৪৫), গামারীর স্ত্রী শান্তি (৬০), ধনঞ্জয়ের স্ত্রী রঞ্জুকুমনি (৫০), মৃত গিরীদাসের স্ত্রী কসুমী (৫০), আরতী (৬০), কুমারী রীনা (৪০), স্বামী পরিত্যক্তা ফুলজারি (৫৬) ও পৌরসভার নতুন বাজার এলাকার বিমল ঘোষের স্ত্রী রাম কুমারীসহ (৪৫) আরো অনেকেই প্রতিনিয়ত ইট ভাঙ্গার আয়ে খেয়ে না খেয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

কোন দিন কাজ না থাকলে এদের অনেককেই ধার দেনা বা না খেয়ে দিন পাড়ি দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে ভূমিহীন উল্লেখিত গৃহবধু ও তাদের স্বামীদের স্বল্প আয়ে এক একটি বিশাল পরিবারের দু’মুঠো খাবারের সংস্থান ছাড়া সঞ্চয় করার মত এদের কাছে আর অবশিষ্ট কিছু থাকে না। ফলে এদের মেয়ে বিয়ে ও বড় কোন অসুখ-বিসুখ থেকে পরিত্রান পেতে ধার-দেনা বা দশ জনের সাহায্য ছাড়া আর অন্য কোন পথ থাকে না। এর পরও ইট ভাঙ্গার কারিগর গৃহবধূরা চরম কষ্টের মাঝে জীবন অতিবাহিত করলেও প্রকৃতির অপার শিল্পী বাবুই পাখির মত এরা কঠোর আত্মনির্ভরশীল হয়ে নিজের ঘর নিজে বাঁধে ও নিজের উপার্জনে খায়, এ অহংকার বুকে ধারন করে একেক জন শক্ত সামর্থ্য পুরুষের গতিতে খেয়ে না খেয়ে জীবন-সংসারের চাকা সচল রেখে চলেছেন।

loading...
error: Content is protected !!