loading...

কালের আবর্তে প্রায় হারিয়েই গেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘হুক্কা’

0

ওমর ফারুক সুমন, হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ) থেকেঃ
আগেত ঘরে ঘরে হুক্কা খাইত। দাদা নানা বেবাক গোষ্ঠি খাইত। আমার দাদা থেইকাই শুরু এইডা। এহন হুক্কা খুইজা পাইনা, এহন একশ টেহা দিলেও হুক্কা ক্ষুইজা পাইতনা। হুক্কা বেছাই নাইগা। এইডা আমি আরও পাঁচ বছর আগে কিনছিলাম। এহন নালিতাবাড়ি নাই, ঝিনাইগাতি নাই, হালুয়াঘাট নাই। এই কথাগুলো বলেন ঝিনাইগাতি উপজেলার গজারিকুড়া গ্রামের ক্লেমেন্ট থিগিদি নামে এক আদিবাসী বৃদ্ধা। বয়স একশ ছোঁই ছোঁই। তিনি বলেন, তার স্ত্রী বিনদিনী রেমা সেও জন্মের পর থেকেই হুক্কা খায়।

আজ কালের আবর্তে প্রায় হারিয়েই গেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সেই ‘হুক্কা’। বহু যুগ আগে থেকেই জনপ্রিয় ধূমপানের একমাত্র মাধ্যম ছিল হুক্কা। এক সময় এই বাংলাদেশে কৃষক, শ্রমিক গ্রামবাংলার উঠোনে সকালে কাজে বের হওয়ার আগে, দুপুরে জমিতে কাজের ফাঁকে কিংবা বিকেল-সন্ধ্যায় আয়েশি ভঙ্গিতে এক ছিলিম তামাকের সাথে খাম্বিরা মিশিয়ে পরম আনন্দে হুক্কা টানতো। এতে কৃষকের ক্লান্তি, শ্রমিকের সান্ত্বনা হুক্কা টানের মধ্য দিয়েই পরিতৃপ্ত হতো। সমাজের বিত্তবান পরিবারের লোকরাও নানা সাজে তামাক তৈরি করে হুক্কায় নল লাগিয়ে পরম আনন্দে তৃপ্তির আস্বাদ নিতো। এটিই ছিল সে সময়কার আনন্দ বিনোদনের অংশ। এখন আর তা দেখা যায় না। এক দুই যুগ আগেও আবহমান বাংলার গ্রামগঞ্জে ধূমপায়ীরা হুক্কার মাধ্যমে তামাকপানে অভ্যস্ত ছিল।

তামাক পাতাকে ছোট করে কেটে চিটাগুড় মিশিয়ে তৈরি হতো হুক্কার প্রধান উপাদান। হুক্কা তৈরির উপাদানগুলোর জন্য সে সময় তামাক পান-সুপারিওয়ালারা বাজারে বিক্রি করতো। এখন আর এগুলো বিক্রি করতে চোখে পড়ে না।এখনও শখে হুক্কা টানেন এমন একজন জানালেন, দৈনিক ১০ হতে ১২ বার হুক্কা সেবন করেন তিনি। হুক্কা সেবন করতে খরচ কম নয়। এক সময় স্থানীয় বাজারে ‘তওমিটা’ পাওয়া গেলেও এখন আর পাওয়া যায় না। এখন এক কেজি তওমিটা ১০০ টাকা। তাও এলাকার একটি নির্দিষ্ট দোকান থেকে ‘তওমিটা’ আনতে হয়। এদিকে দৈনিক সকালে হুক্কার পানি বদলাতে হয়। আর হুক্কার টিক্কা তৈরি করতে হয় শিম গাছের লতাকে পুড়িয়ে ও ভাতের মাড় দিয়ে।

বিড়ি-সিগারেট থেকে হুক্কা সেবন ভালো কি না, জানতে চাইলে ক্লেমেন্ট থিগিদি বলেন, এইগুলা খাইলে ভালা লাগে, জ্ঞান বাড়ে। যহন বন্ধ (ক্ষেত) যাইব, পরিশ্রম অইব, টহন টান দিয়া চিন্তা করব, কোন কাজটা করব। এই বৃদ্ধা জানান, পাকিস্তান আমলে মহাজনের ঘরে দিনমজুরের কাজ করার সময় থেকে হুক্কা সেবন করে আসছি। সেজন্য এখনও সেবন করি। তবে হুক্কার স্বাদই আলাদা। হুক্কা সেবন করলে পেটে ভালো লাগে। বিড়ি-সিগারেট থেকে খরচ অনেক বেশি পড়ে। তিনি জানান, এক সময় ঘরে ঘরে হুক্কা সেবন চলতো। এখন হাজারে এক হুক্কা সেবন করা চোখে পড়বে। হুক্কা আর চোখে পড়ে না। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই খাওয়া তো দূরের কথা চোখেই দেখেনি হুক্কা।

হুক্কার জায়গা দখল করে নিয়েছে বিড়ি, সিগারেটসহ অন্যন্য মাদকদ্রব্য। বর্তমান প্রজন্মের জন্য হুক্কা একটি আশ্চর্য বিষয়। এদিকে বর্তমানে বিভিন্ন মানুষের কাছে হুক্কা থাকলেও এর উপাদানগুলো বাজারে না পাওয়ার কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে হুক্কা সেবন ছেড়ে দিয়েছে।সে সময় গ্রামের সাংস্কৃতির প্রাচীন নিদর্শন ছিলো হুক্কা। মজুর থেকে শুরু করে জমিদার বাড়ি পর্যন্ত হুক্কার প্রচলন ছিল সর্বত্রই। বাহারি ধরনের হুক্কা তৈরি হতো নারকেলের মালাই দিয়ে। তার সঙ্গে সাবধানে লাগানো হতো কারুকার্য করা কাঠের নল আর তার ওপর মাটির ছিলিম বা কলকি বসিয়ে তামাক সাজানো হতো। নারকেলের মালাই ভর্তি থাকতো পানি। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে সবাই হুক্কা খেতো।

শীতের সকালে মহাজন বাড়ির কাচারি থেকে শুরু করে জমিদার বাড়ির কাচারি পর্যন্ত হুক্কা ছিল নিজস্ব জায়গায়। পালাবদল করে হুক্কা খাওয়া চলতো সবার মাঝে। জমিদার বাড়ির এবং স্বচ্ছল পরিবারগুলোতে হুক্কা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। সেসব হুক্কায় থাকতো লম্বা পাইপ আর সেই লম্বা পাইপের মাথায় থাকা হুক্কা তামাক থাকতো। নলটি মুখে দিয়ে আয়েশ করে হুক্কা টানতা মহাজনরা। হুক্কার উপকারিতাও ছিল অনেক। দেহের পেটের পীড়া, শরীরের আঘাতসহ নানাবিধ রোগে হুক্কার পানি ছিল মহৌষধ। গরুর ক্ষুরা রোগের চিকিৎসা করা হতো। হুক্কার স্থান দখল করে নিয়েছে বিড়ি-সিগারেট আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে তামাক দিয়ে তৈরি এক ধরনের নেশা। আধুনিক যুগের ছেলেমেয়ে হুক্কা দেখেনি, তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পরিচয়ের জন্য হুক্কা সংরক্ষণ খুবই জরুরি।

loading...